কটন সুতা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার: পোশাকখাতে শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৩ বার
কটন সুতা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার: পোশাকখাতে শঙ্কা

প্রকাশ:  ১৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এমন প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বস্ত্র ও পোশাক—এই দুই খাতের মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পোশাক শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, সুতা আমদানির স্বাভাবিক প্রবাহকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে যে সিদ্ধান্তের পাঁয়তারা চলছে, তা বাস্তবায়িত হলে পুরো পোশাকখাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে। এর মধ্যে নিট পোশাকের অবদানই প্রায় ৫৫ শতাংশ, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিট পোশাক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হলো ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট কটন সুতা। এই ধরনের সূতার বড় একটি অংশ আমদানি করা হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে, কারণ দেশীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা পূরণ সম্ভব হয় না। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুণগত মান, সময়মতো সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে ভারতীয় সুতা দীর্ঘদিন ধরেই পোশাকখাতের জন্য নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, বন্ড সুবিধায় কটন সুতা আমদানি গত দুই অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সময়ে দেশীয় সুতা কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও বিক্রি কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীরা দাবি করছেন, তুলনামূলক কম দামে ভারতীয় সুতা আমদানির ফলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে এবং এ বিষয়ে এনবিআরকে চিঠি পাঠিয়েছে।

তবে পোশাক শিল্পমালিকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত হবে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’। তাদের বক্তব্য, দেশীয় সুতা শিল্পের সমস্যার দায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর পোশাকখাতের ওপর চাপানো বাস্তবসম্মত নয়। সোমবার ১৯ জানুয়ারি কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশের প্রতিবাদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি জানায়, সুতা আমদানির স্বাভাবিক চিত্রকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে পোশাক খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা একে দেশের রফতানিমুখী শিল্পের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশের পোশাকখাত কার্যত মুখ থুবড়ে পড়বে। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বস্ত্র ও পোশাক খাত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। তাই সরকারি মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

পোশাক শিল্পমালিকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, দেশীয় বস্ত্র কারখানাগুলোর বড় অংশ এখনও প্রয়োজনীয় মান ও বৈচিত্র্যের সুতা সরবরাহে সক্ষম নয়। বিশেষ করে নিট পোশাকের জন্য নির্দিষ্ট কাউন্টের সুতা নিরবচ্ছিন্নভাবে ও মানসম্মতভাবে পাওয়া যায় না। বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ভারতের সুতা আমদানিতে এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের মতো নীতিগত বিকল্প থাকতে পারে, কিন্তু সরাসরি বন্ড সুবিধা বাতিল করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তার মতে, এতে কাঁচামালের খরচ বাড়বে, উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের দাম প্রতিযোগিতামূলক থাকবে না।

অন্যদিকে, দেশীয় সুতা উৎপাদনকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা অসম প্রতিযোগিতার শিকার। তাদের দাবি, ভারতীয় সুতা কম দামে রফতানি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে তাদের পণ্যের চাহিদা কমছে। তবে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করেন, এই সমস্যার মূল কারণ আমদানিনির্ভরতা নয়; বরং দেশীয় বস্ত্র শিল্পে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং নীতি সহায়তার অভাব। তাদের মতে, এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে আমদানিতে বাধা দিলে পুরো শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বস্ত্র ও পোশাক খাতের মধ্যে এই টানাপোড়েন নতুন নয়, তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক মন্দা, ক্রেতাদের মূল্যচাপ এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে। এমন অবস্থায় কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দ্রুতই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একতরফা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সমন্বিত নীতি প্রণয়নই হতে পারে উত্তরণের পথ। সরকার যদি দেশীয় সুতা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে প্রণোদনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রফতানিমুখী পোশাকখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সব মিলিয়ে, কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ শুধু একটি শুল্ক বা নীতিগত পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি দেশের সবচেয়ে বড় রফতানিমুখী শিল্পের ভবিষ্যৎ ও লাখো শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সরকার বিষয়টি রাজনৈতিক বা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সময়োচিত ও ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগই পারে বস্ত্র ও পোশাক—উভয় খাতকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত