প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আর্থিক খাতকে নাড়িয়ে দেওয়া আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছাল বিচারিক প্রক্রিয়া। এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও আর্থিক খাতে বহুল আলোচিত নাম প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পি কে হালদার নামেই বেশি পরিচিত, তাঁদেরসহ মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের মামলায় বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত। জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা এই মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশনের করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার দুপুরে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত–৯–এর বিচারক মোহাম্মদ আবদুস সালাম শুনানি শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে এই মামলার বিচার শুরু হওয়ায় আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদারসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের ১২ আগস্ট ‘মেসার্স মোস্তফা অ্যান্ড কোং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেয়াদি ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর সেই ঋণ বিতরণ করা হলেও, নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে তা অন্যত্র স্থানান্তর করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসাৎ করা হয়।
এই মামলায় এস আলম গ্রুপ ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের একাধিক শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সামাদ, পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ হাসান ও শাহানা ফেরদৌস মামলার আসামি। পাশাপাশি রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট রাশেদুল হক, সাবেক ম্যানেজার নাহিদা রুনাই, সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী আহমেদ জামাল এবং সাবেক ডেপুটি ম্যানেজার জুমারাতুল বান্নার নামও চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মাররিন ভেজিটেবল অয়েলসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ, পরিচালক টিপু সুলতান, মোহাম্মদ ইসহাক ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আসামিদের মধ্যে নাহিদা রুনাই ও রাশেদুল হক কারাগারে রয়েছেন। বাকি আসামিরা পলাতক থাকায় তাঁরা চার্জগঠন শুনানিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত দুই আসামির পক্ষে তাঁদের আইনজীবীরা অব্যাহতির আবেদন করেন। তবে আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করে চার্জ গঠনের আদেশ দেন। চার্জগঠনের সময় নাহিদা রুনাই ও রাশেদুল হক নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
দুদকের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান শুনানি শেষে সাংবাদিকদের জানান, মামলার অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ থাকায় আদালত চার্জ গঠন করেছেন। তিনি বলেন, পলাতক আসামিরা আদালতে উপস্থিত না থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার কার্যক্রম চলবে। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এই মামলার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী মহলের অনৈতিক প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ। পি কে হালদার নামটি ইতোমধ্যে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট এই মামলাটিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার বিচার শুরু হওয়া শুধু একটি মামলার অগ্রগতি নয়, বরং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষাও বটে। কারণ, অভিযুক্তদের মধ্যে দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার ও প্রভাবশালী আর্থিক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। অতীতে এ ধরনের মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ার নজির থাকলেও, দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ ও রায় নিশ্চিত করা গেলে এটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
এর আগে চলতি মাসের ১১ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলার চার্জশিট গ্রহণ করেন। এরপর মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার বিশেষ জজ আদালত–৯–এ পাঠানো হয়। তদন্ত শেষে গত বছরের ১৬ অক্টোবর দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান এই মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। চার্জশিটে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের একাধিক ধারায় অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া আর্থিক খাতের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের অভিযোগে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। বড় অঙ্কের এই মামলাগুলোর সুষ্ঠু বিচার হলে সেই আস্থা কিছুটা হলেও ফিরতে পারে। একই সঙ্গে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
এখন সবার নজর আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির দিকে, যেদিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের রায় কী দাঁড়ায়, তা শুধু এই মামলার অভিযুক্তদের ভবিষ্যৎই নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের পথচলাকেও প্রভাবিত করবে।