প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাস কয়েক আগেও বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে জেসি বাকলি নামটি ছিল পরিচিতদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ। সিনেমা ও টেলিভিশনে দীর্ঘদিন কাজ করলেও তিনি তখনো মূলধারার ‘অস্কার-দৌড়ের’ কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না। কিন্তু সময় খুব দ্রুত বদলায়। গোল্ডেন গ্লোবে ড্রামা বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতার পরই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেছে—এ বছর অস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে উচ্চারিত নামগুলোর একটি জেসি বাকলি। ক্লোয়ি ঝাও পরিচালিত আলোচিত সিনেমা ‘হ্যামনেট’-এ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের স্ত্রী অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় শুধু দর্শক নয়, সমালোচকদেরও বিস্মিত করেছে। অনেকের ধারণা, অস্কারের সোনালি মূর্তিটি এবার উঠতে পারে ৩৬ বছর বয়সী এই আইরিশ অভিনেত্রীর হাতেই।
জেসি বাকলির এই যাত্রা এক দিনের নয়। অভিনয়, গান ও মঞ্চ—তিন মাধ্যমেই দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিনি। আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া জেসির শিল্পীসত্তার বিকাশ শুরু খুব অল্প বয়সেই। ২০০১ সালে প্রায় ৪০ হাজার প্রতিযোগীর ভিড় থেকে রয়্যাল আইরিশ একাডেমি অব মিউজিকের ‘হাই অ্যাচিভার’ অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন তিনি। এই স্বীকৃতি তাঁর প্রতিভার প্রাথমিক প্রমাণ হলেও পরিচিতি আসে আরও কিছু পরে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিবিসির জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান ‘আই উড ডু এনিথিং’-এ অংশ নিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো বৃহত্তর দর্শকের নজরে আসেন।
সেই পথ ধরেই জেসি পা রাখেন লন্ডনের রয়্যাল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টে। অভিনয়ে স্নাতক শেষ করার পর টেলিভিশন ও থিয়েটারে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। টিভি সিরিজ ‘ট্যাবু’, ‘ফার্গো’ ও ‘চেরনোবিল’-এ তাঁর অভিনয় আলাদা করে প্রশংসিত হয়। মঞ্চেও তিনি নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। হলিউড তারকা জুড ল–এর সঙ্গে ‘হেনরি ফাইভ’ নাটকে অভিনয় করে প্রমাণ করেছেন, শেক্সপিয়ারের ভাষা ও আবেগ বহন করার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। আজ ‘হ্যামনেট’-এ এসে যেন সেই প্রস্তুতিরই পূর্ণতা দেখা যাচ্ছে।
এর আগেও অস্কারের কাছাকাছি গিয়েছিলেন জেসি। ২০২২ সালে ‘দ্য লস্ট ডটার’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে অস্কারে মনোনীত হন। যদিও তখন তিনি বৈশ্বিক তারকা হয়ে ওঠেননি, তবে সমালোচকেরা বুঝেছিলেন, এই অভিনেত্রীর ভেতরে বড় কিছু করার শক্তি আছে। ‘হ্যামনেট’ সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
‘হ্যামনেট’ সিনেমার গল্প মূলত শেক্সপিয়ারের হারিয়ে যাওয়া পুত্রের শোককে ঘিরে। ইতিহাসে খুব কমই আলোচিত শেক্সপিয়ারের স্ত্রী অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই গল্পটি বলা হয়েছে। সন্তান হারানোর গভীর বেদনা, নিঃসঙ্গতা আর এক সৃষ্টিশীল মানুষের পরিবারে বসবাসের নীরব সংগ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে চরিত্রটি ছিল ভীষণ সংবেদনশীল। সমালোচকদের মতে, জেসি বাকলি এই শোককে এমনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন, যা আগে খুব কমই দেখা গেছে। তিনি যেন অভিনয় করেননি, বরং নিজেকে চরিত্রটির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বিলীন করে দিয়েছেন।
ভোগ সাময়িকীতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেসি বলেন, তিনি গান ও অভিনয়ের মধ্যেই বড় হয়েছেন। কৈশোর থেকেই শিল্পচর্চার মধ্যে থাকায় চরিত্রের চাহিদা তিনি অবচেতনভাবেই বুঝতে পারেন। তাঁর ভাষায়, এই সিনেমা সন্তান হারানোর শোক নিয়ে, কিন্তু শুটিং শুরুর আগে তিনি আলাদা কোনো কৌশল তৈরি করেননি। চিত্রনাট্য পড়েই জানতেন, এটি এক শোকে বিহ্বল মায়ের গল্প। শুটিং শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেই শোক তাঁর ভেতরে প্রবেশ করেছে। শুরুতে যে ভয় কাজ করছিল, সেটাও সময়ের সঙ্গে কেটে গেছে। তিনি মনে করেন, এই সিনেমার অংশ হতে পারা তাঁর জন্য গর্বের।
জেসির অভিনয়জগৎ গড়ে ওঠার পেছনে যাঁদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তাঁদের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। ফ্রান্সেস ম্যাকডোরমান্ড, ক্যাথরিন হেপবার্ন, বেটি ডেভিস, বারবারা স্ট্যানউইক ও লরা ডার্নের মতো অভিনেত্রীরা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন। জেসির মতে, তাঁরা এত জীবন্ত ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন যে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে তাঁদের কাজ অবচেতনে তাঁকে প্রভাবিত করে। এই প্রভাব হয়তো ‘হ্যামনেট’-এ অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের চরিত্রে তাঁর গভীরতা ও সংযমের মধ্যেই ধরা পড়ে।
অস্কার নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। যদিও চূড়ান্ত মনোনয়ন এখনো ঘোষণা হয়নি, তবু চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা ধরে নিচ্ছেন, সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জেসির প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বেশ কঠিন। সম্ভাব্য প্রতিযোগীদের তালিকায় আছে চেইজ ইনফিনিটি, রেনাতে রেইনসভে ও এমা স্টোনের নাম। তবু গোল্ডেন গ্লোব ও ক্রিটিকস চয়েজ অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রী হওয়ার পর জেসির অবস্থান অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এসব পুরস্কার অস্কারের দৌড়ে বড় ইঙ্গিত হিসেবেই ধরা হয়।
তবে জেসি নিজে এসব হিসাব–নিকাশে খুব একটা মনোযোগী নন। তাঁর কথায়, বছরটা দারুণভাবে শুরু হয়েছে, যা তিনি কল্পনাও করেননি। তিনি আপাতত সেটুকুতেই খুশি। অস্কার পাবেন কি না, সেই উত্তেজনার চেয়ে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজের অভিজ্ঞতা ও গল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারা।
জেসি বাকলির গল্প তাই শুধু একটি পুরস্কারের গল্প নয়। এটি এক শিল্পীর ধীরে ধীরে পরিণত হওয়ার গল্প, যেখানে প্রতিভা, অধ্যবসায় ও সঠিক সময় এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। ‘হ্যামনেট’-এ শেক্সপিয়ারের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু ইতিহাসের এক অবহেলিত নারীকেই সামনে আনেননি, বরং আধুনিক সিনেমায় শোক ও নীরবতার ভাষাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। অস্কারের মঞ্চে তাঁর নাম ডাক পড়ুক বা না পড়ুক, জেসি বাকলি ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছেন—তিনি সমসাময়িক অভিনয়জগতের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।