প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বাজারে ফের ইতিহাস গড়ল সোনা। টানা দরবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় সোনা ও রুপা—উভয় ধাতুর দামই নতুন রেকর্ড স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার থেকে দেশের বাজারে প্রতি ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৯ টাকায়। এক দিনে ভরিপ্রতি চার হাজার ১৯৯ টাকা বেড়ে এই দামে পৌঁছেছে সোনা, যা দেশের স্বর্ণবাজারে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
বাজুস জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়, যা আজ থেকে কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের মূল্য বৃদ্ধির কারণেই এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের গয়না বাজারে আবারও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ক্রেতা, বিক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—সোনার এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কত দূর পর্যন্ত যাবে।
নতুন দর অনুযায়ী সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেট সোনার এক ভরি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৯ টাকা। এর আগের দামের তুলনায় যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৮ হাজার ৩১ টাকা। ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ৪৩০ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার ১৪৭ টাকা।
সোনার দামের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রুপার দামও রেকর্ড করেছে। দেশের বাজারে একযোগে এত উচ্চ দামে সোনা ও রুপা বিক্রির ঘটনা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। বাজুসের নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের রুপার এক ভরি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় হাজার ২৪০ টাকা। ২১ ক্যারেটের রুপার ভরি পাঁচ হাজার ৯৪৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটের রুপার ভরি পাঁচ হাজার ১৩২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার দাম দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৮৪৯ টাকা।
স্বর্ণবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি এর অন্যতম প্রধান কারণ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ডলারের ওঠানামা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুত বাড়ানোর প্রবণতা আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়াচ্ছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার সরবরাহ সংকট এবং ডলারের উচ্চমূল্যও দাম বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজুসের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই সোনার দাম বাড়ে, তখন কিছুটা সময়ের ব্যবধানে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে সোনার বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় ডলারের দাম বাড়লে স্বর্ণের দামও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এ ছাড়া পরিশোধিত বা তেজাবি সোনার দাম বাড়লে গয়না তৈরির কাঁচামালের খরচও বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।
সোনার এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে যারা গয়না কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য স্বর্ণের নতুন দাম বড় চাপ তৈরি করেছে। রাজধানীর স্বর্ণের দোকানগুলোতে কথা বলে জানা গেছে, দাম বাড়ার পর থেকেই অনেক ক্রেতা কেনাকাটা স্থগিত করছেন বা কম গয়না কিনছেন। কেউ কেউ পুরোনো গয়না বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহের কথাও ভাবছেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের একাংশের কাছে সোনার এই দরবৃদ্ধি আশীর্বাদ হিসেবেও দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে সোনার চাহিদা বাড়ে, ফলে দামও ঊর্ধ্বমুখী থাকে। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, ভবিষ্যতেও সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। তাই এখনো যারা সোনায় বিনিয়োগ ধরে রেখেছেন, তারা লাভবান হচ্ছেন।
অন্যদিকে, রুপার দাম বৃদ্ধিও বাজারে আলাদা আলোচনা তৈরি করেছে। সাধারণত রুপার দাম সোনার তুলনায় কম ওঠানামা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প খাতে রুপার ব্যবহার বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট এবং বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে রুপার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এর দামও বাড়ছে। ফলে রুপার গয়নাও এখন আগের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারের এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। গয়না কেনার সময় অবশ্যই বাজুস নির্ধারিত দরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত এবং মেকিং চার্জ বা ভ্যাটের বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সোনা কিনলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার, কারণ স্বর্ণের দাম সব সময় একইভাবে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে, দেশের স্বর্ণবাজার এখন এক অনিশ্চিত কিন্তু আলোচিত সময় পার করছে। সোনার ভরি দুই লাখ ৩৮ হাজার টাকা ছাড়ানো শুধু একটি সংখ্যাই নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাজার ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার প্রতিফলনও বটে। সামনে দাম আরও বাড়বে নাকি স্থিতিশীল হবে—সেই অপেক্ষায় এখন পুরো বাজার।