ফ্যাশনের রাজপুত্র ভ্যালেন্তিনোর নীরব বিদায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫০ বার
ফ্যাশনের রাজপুত্র ভ্যালেন্তিনোর নীরব বিদায়

প্রকাশ: ২০  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব ফ্যাশন জগত আজ শোকস্তব্ধ। নীরবে, আড়ম্বরহীনভাবে বিদায় নিয়েছেন ইতালির কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার ভ্যালেন্তিনো গারাভানি। ‘ভ্যালেন্তিনো’ নামে যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন, তার মৃত্যু হয়েছে ৯৩ বছর বয়সে। সোমবার ইতালির রাজধানী রোমে নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের ভালোবাসা ও সান্নিধ্যে তার জীবনের পর্দা নামে। তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কারণ জানানো না হলেও ফ্যাশনবিশ্বে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

ভ্যালেন্তিনো গারাভানি ছিলেন বিশ শতকের ফ্যাশন ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিলাসিতা, আভিজাত্য ও নিখুঁত নান্দনিকতার যে সংজ্ঞা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও আধুনিক ফ্যাশনের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ডিজাইন করা পোশাক পরেছেন হলিউড ও রাজনীতির অগণিত প্রভাবশালী নারী—এলিজাবেথ টেলর, ন্যান্সি রিগ্যান, শ্যারন স্টোন, জুলিয়া রবার্টস, গুইনেথ প্যালট্রোর মতো তারকারা ভ্যালেন্তিনোর নকশায় নিজেদের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বকে আরও দীপ্ত করেছেন।

১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ভ্যালেন্তিনো’ ফ্যাশন হাউসের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে বিশ্ব ফ্যাশনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। সেই সময় ইউরোপীয় ফ্যাশনে যখন নতুন ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির খোঁজ চলছিল, ভ্যালেন্তিনো তখন সৌন্দর্যের ক্লাসিক ধারণাকে আধুনিকতার সঙ্গে মেলাতে সক্ষম হন। জর্জিও আরমানি ও কার্ল ল্যাগারফেল্ডের মতো কিংবদন্তিদের পাশে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি, কিন্তু কারও ছায়ায় হারিয়ে যাননি কখনো।

১৯৩২ সালের মে মাসে ইতালির লোম্বার্দি অঞ্চলে জন্ম নেওয়া ভ্যালেন্তিনোর ফ্যাশনের প্রতি আকর্ষণ খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ পায়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি পাড়ি জমান প্যারিসে—ফ্যাশনের রাজধানীতে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ পান জাক ফাথ, বালেন্সিয়াগা, জ্যাঁ দেসে ও গি লারোশের মতো কিংবদন্তি ডিজাইনারদের সঙ্গে। এই অভিজ্ঞতাই তাকে তৈরি করে ভবিষ্যতের ভ্যালেন্তিনো হিসেবে, যার নাম একদিন নিজেই হয়ে উঠবে একটি ব্র্যান্ড।

স্পেন সফর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা তার সিগনেচার রং ‘ভ্যালেন্তিনো রেড’ তাকে এনে দেয় অনন্য পরিচিতি। লালের এই বিশেষ শেড কেবল একটি রং নয়, বরং এক ধরনের আবেগ ও সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে। আইকনিক ‘ফিয়েস্তা ড্রেস’-এর মাধ্যমে এই রং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় এবং ধীরে ধীরে ভ্যালেন্তিনোর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়। ফ্যাশন দুনিয়ায় বলা হতো, লাল যদি রাজকীয় হয়, তবে তার রাজার নাম ভ্যালেন্তিনো।

২০০৮ সালে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ কালেকশন উপস্থাপন করেন ভ্যালেন্তিনো। সেই শো ছিল আবেগে ভরা এক বিদায়ী মুহূর্ত। র‌্যাম্পে হাঁটা সব মডেলই লাল পোশাকে সজ্জিত ছিলেন, যেন ‘ভ্যালেন্তিনো রেড’-এর প্রতি তার আজীবন ভালোবাসার নীরব ঘোষণা। সেই দৃশ্য আজও ফ্যাশন ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

শুধু চলচ্চিত্র তারকা নয়, রাজপরিবারের সদস্যদের পোশাক নকশাতেও তার ছিল বিশেষ অবদান। ২০১৩ সালের জুনে সুইডেনের প্রিন্সেস মাদেলেইনের বিয়ের পোশাক ডিজাইন করেন ভ্যালেন্তিনো। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে তৈরি সেই পোশাক প্রশংসিত হয় বিশ্বজুড়ে। প্রিন্সেস মাদেলেইন ব্রিটিশ-আমেরিকান অর্থলগ্নিকারী ক্রিস্টোফার ও’নিলকে বিয়ে করেন, আর সেই রাজকীয় অনুষ্ঠানে ভ্যালেন্তিনোর নকশা আরও একবার প্রমাণ করে তার কালজয়ী দক্ষতা।

ভ্যালেন্তিনোর জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়, এটি ছিল নান্দনিকতার প্রতি নিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি কখনো নিজেকে সবচেয়ে ট্রেন্ডি বা পরীক্ষামূলক ডিজাইনার হিসেবে তুলে ধরতে চাননি। বরং তার লক্ষ্য ছিল সুন্দর পোশাক তৈরি করা—যা নারীর ব্যক্তিত্বকে সম্মান করে, তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এই দর্শনই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ভ্যালেন্তিনো গারাভানি ও জিয়ানকার্লো জিয়ামেত্তি ফাউন্ডেশন জানায়, রোমে নিজের বাড়িতে পরিবারের ভালোবাসায় ঘেরা অবস্থায় তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ফাউন্ডেশন আরও জানিয়েছে, ২১ ও ২২ জানুয়ারি রোমের পিয়াজা মিনিয়ানেলিতে ভ্যালেন্তিনোর মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপর ব্যাসিলিকা অব সেন্ট মেরি অব দ্য অ্যাঞ্জেলস অ্যান্ড মার্টায়ার্সে অনুষ্ঠিত হবে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান।

ভ্যালেন্তিনোর মৃত্যুতে ফ্যাশন জগতের অনেকেই আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ব্রিটিশ ভোগ সাময়িকীর সাবেক সম্পাদক-ইন-চিফ আলেক্সান্দ্রা শুলম্যান বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক খবর। আধুনিক যুগের শেষ দিকের মহান ডিজাইনারদের একজন ছিলেন তিনি। মানুষ একজন ফ্যাশন ডিজাইনারকে যেমন কল্পনা করে, ভ্যালেন্তিনো ঠিক তেমনই ছিলেন। তার ব্যক্তিত্ব, রুচি ও কাজ—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের রাজকীয় সৌন্দর্য।

শুলম্যান আরও বলেন, ভ্যালেন্তিনো কখনো ফ্যাশনের ট্রেন্ডের পেছনে ছোটেননি। তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন এবং সুন্দর পোশাক তৈরির মধ্যেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই সততা ও নিষ্ঠাই তাকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

ভ্যালেন্তিনো গারাভানির বিদায়ের মধ্য দিয়ে ফ্যাশন জগত হারাল এক নীরব রাজপুত্রকে, যিনি শব্দের চেয়ে নকশার মাধ্যমে বেশি কথা বলতেন। কিন্তু তার সৃষ্টি, তার রং, তার দর্শন—সবকিছুই থেকে যাবে যুগের পর যুগ, অনুপ্রেরণা হয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত