প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকাই সিনেমার আলোচিত ও বিতর্কিত অভিনেত্রী পরীমণির অভিনয়জীবনে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে এক ভিন্ন মাত্রা। বাণিজ্যিক ছবির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে তিনি নাম লেখালেন সাহিত্যনির্ভর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ছোটগল্প ‘শাস্তি’ অবলম্বনে নির্মিত একই নামের সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন পরীমণি। তাঁর বিপরীতে থাকছেন দেশের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে যে আকাঙ্ক্ষা তিনি নিজের মধ্যে লালন করে আসছিলেন, অবশেষে সেটিই বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে—এমনটাই বলছেন অভিনেত্রী নিজেই।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিনেমাটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন নির্মাতা লিসা গাজী, অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, পরীমণি এবং চলচ্চিত্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা ও কলাকুশলীরা। অনুষ্ঠানের আবহেই স্পষ্ট ছিল, এটি কেবল আরেকটি নতুন সিনেমার ঘোষণা নয়; বরং পরীমণির ক্যারিয়ারে এটি এক ধরনের টার্নিং পয়েন্ট।
অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে পরীমণি আবেগ লুকাতে পারেননি। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আনন্দ তাঁর কণ্ঠে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তিনি বলেন, অনেকেই তাঁকে প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, কোন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে তাঁর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। উত্তরে তিনি বারবারই উল্লেখ করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্মের কথা। বিশেষ করে ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরা চরিত্রটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরীমণির ভাষায়, এই চরিত্রটি শুধু অভিনয়ের সুযোগ নয়, বরং একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে ভেঙে নতুন করে আবিষ্কারের একটি ক্ষেত্র।
পরীমণি জানান, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি চরিত্রের অপেক্ষায় ছিলেন, যা তাঁকে মানসিক ও অভিনয় দক্ষতার দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। তাঁর মতে, ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরা একদিকে যেমন সাহসী, তেমনি সমাজের কঠিন বাস্তবতায় নিষ্পেষিত এক নারীর প্রতিচ্ছবি। সেই চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরতে পারাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
নিজের বর্তমান ক্যারিয়ার ও কাজের ধরণ নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সচেতনভাবেই এমন কাজ বেছে নিচ্ছেন, যেখানে প্রথাগত নায়িকা ইমেজ নেই। তাঁর ভাষায়, শুধু বাণিজ্যিক ছবিতে ঝলমলে পোশাক আর নাচ-গানে সীমাবদ্ধ থাকলে একজন শিল্পী হিসেবে তৃপ্তি আসে না। দর্শকের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার মতো একটি কাজই তাঁর মূল লক্ষ্য। সেই জায়গা থেকেই ‘শাস্তি’ ছবিটি তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
পরীমণির মতে, এই সিনেমার মাধ্যমে তিনি দর্শকের সামনে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, রবীন্দ্রনাথের গল্পে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা মানেই দায়িত্ব অনেক বেশি। কারণ, এখানে শুধু বিনোদনের প্রশ্ন নয়, সাহিত্যিক আবহ, চরিত্রের গভীরতা ও সামাজিক বার্তা—সবকিছু মিলিয়ে কাজটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে হয়।
এই ছবিতে পরীমণির সঙ্গে চঞ্চল চৌধুরীর জুটি নিয়েও দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চঞ্চল চৌধুরী নিজেও সাহিত্যনির্ভর ও চরিত্রনির্ভর কাজের জন্য সুপরিচিত। তাঁর অভিনয় মানেই দর্শকের প্রত্যাশা থাকে আলাদা কিছু দেখার। পরীমণির মতো একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর এই প্রথম বড় পরিসরের সাহিত্যভিত্তিক কাজে যুক্ত হওয়া, সিনেমাটিকে ঘিরে আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্মাতা লিসা গাজী জানান, ‘শাস্তি’ গল্পটি পর্দায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা মূল গল্পের আবহ ও আবেগ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করবেন। তবে সিনেমার ভাষায় গল্পটি বলার জন্য কিছু জায়গায় প্রয়োজনীয় রূপান্তর থাকবে। তাঁর মতে, এই গল্প আজও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ সমাজে নারীর অবস্থান, ন্যায়বিচার এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্ন এখনও আমাদের সামনে জ্বলন্ত বাস্তবতা।
পরীমণি তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। অনেক সময় বড় নায়কদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে শিডিউল বা সমন্বয়ের সমস্যা তৈরি হয়। তবে এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে হতাশ না করে বরং আরও সচেতন করেছে। এখন তিনি শুধুমাত্র ভালো গল্প ও শক্ত চরিত্রের দিকেই মনোযোগ দিতে চান। তাঁর মতে, একজন অভিনেত্রী হিসেবে টিকে থাকতে হলে নিজেকে প্রতিনিয়ত ভাঙতে হয়, নতুনভাবে গড়ে তুলতে হয়।
এই সিনেমার ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন পরীমণির ক্যারিয়ার নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পেশাগত সিদ্ধান্ত—সবকিছুই তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। তবে এই প্রকল্পটি যেন সেই সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর শিল্পীসত্তাকে নতুন করে সামনে আনার সুযোগ করে দিচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শাস্তি’ ছোটগল্পটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। নারীর আত্মত্যাগ, সামাজিক অন্যায় এবং নৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই গল্প পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে। সেই গল্পকে আধুনিক সিনেমার ভাষায় উপস্থাপন করা যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি সম্ভাবনাময়ও। পরীমণির মতো একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন—এটি বাংলা সিনেমার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘শাস্তি’ চলচ্চিত্রটি শুধু পরীমণির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের গল্প নয়; এটি ঢাকাই সিনেমায় সাহিত্যনির্ভর কাজের ধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। দর্শক এখন অপেক্ষায়, বড় পর্দায় রবীন্দ্রনাথের চন্দরা চরিত্রে পরীমণিকে দেখার। এই অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত—যেখানে জনপ্রিয়তা ও শিল্পমান একসঙ্গে পথ চলতে পারে।