নিলাম জটেই বন্দি কনটেইনার, বেকায়দায় চট্টগ্রাম কাস্টমস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৮ বার
নিলাম জটেই বন্দি কনটেইনার, বেকায়দায় চট্টগ্রাম কাস্টমস

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আইনি জটিলতা, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতার জালে আটকে নিলাম না হওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্য বোঝাই কনটেইনার নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। বছরের পর বছর ধরে আমদানিকারকের ছাড় না করা এসব কনটেইনার বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্যও নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারি নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন বন্দরের জায়গা সংকট তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিপুল রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা বাড়ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আমদানিকারকের ছাড় না করা ২০ ফুট সাইজের ২ হাজার ৮৭৮ টিইইউএস এবং ৪০ ফুট সাইজের ৭ হাজার ৪৫৪ টিইইউএস কনটেইনার বন্দরে পড়ে আছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ৬৯ হাজার ৮৬০ এলসিএল ও ৬ হাজার ৬৭ প্যাকেজ বাল্ক পণ্য। সব মিলিয়ে ১০ হাজারেরও বেশি কনটেইনার পণ্য নিলাম প্রক্রিয়ার বাইরে পড়ে থাকায় কাস্টমস কার্যত অচল অবস্থার মুখে পড়েছে। হাজার কোটি টাকা মূল্যের এসব পণ্য নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও আইনি বাধার কারণে নিলামে বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব কনটেইনার পড়ে থাকার কারণে বন্দরের স্বাভাবিক অপারেশন ব্যাহত হচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক ওমর ফারুক জানান, পুরোনো কনটেইনার জমে থাকায় নতুন পণ্য খালাসে সমস্যা হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা মালামালে চুরি, অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বন্দরের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা—দুটিই এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্য ৩০ দিনের মধ্যে ছাড় না করালে কাস্টমস আইন অনুসারে তা নিলামে তোলার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নিলাম প্রক্রিয়ায় গেলেই শুরু হচ্ছে নতুন জটিলতা। চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম বলেন, অনেক আমদানিকারক নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হলে আদালতে মামলা করে সেটি স্থগিত করে দেন। এতে নিলাম আটকে যায় এবং বছরের পর বছর পণ্য পড়ে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকার কারণে অনেক পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়, যা পরে আর বিক্রিযোগ্য থাকে না।

সরেজমিনে নিলাম শেড ঘুরে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২০ বছর আগের আমদানিকৃত পণ্যও সেখানে পড়ে আছে। কোনো কোনো কনটেইনারে থাকা খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, আবার কিছু শিল্পপণ্যের কার্যকারিতা পুরোপুরি হারিয়েছে। কেমিক্যাল টেস্ট, মামলা নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দেরির কারণে এসব পণ্য ছাড় না হওয়ায় রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পণ্যের বড় অংশ এখন আর কোনো কাজে আসার মতো অবস্থায় নেই।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে মোট ২ হাজার ১৫ কনটেইনার পণ্য নিলামের জন্য তোলা হলেও বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৭৩ কনটেইনার। এর মধ্যেও বিপত্তি শেষ হয়নি। বিক্রি হওয়া পণ্যের মধ্যে মাত্র ৫০৯ কনটেইনারের ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৫৬৪ কনটেইনার পণ্য এখনো কাস্টমস ও বন্দরের বিভিন্ন শেডে আটকে আছে। অর্থাৎ নিলামে বিক্রি হলেও সেগুলোর ডেলিভারি না হওয়ায় কাস্টমসের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

কাস্টমস বিডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, বড় লটের কিছু খাদ্যপণ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। পরবর্তীতে সেগুলো পশু খাদ্য হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও ডেলিভারি দেওয়া হয়নি। তার প্রশ্ন, এই ক্ষতির দায় কার? বিডাররা নিলামে অংশ নিয়ে অর্থ জমা দিলেও পণ্য না পাওয়ায় তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এই অবস্থায় নিলাম প্রক্রিয়ায় গতি আনা এবং বিক্রি হওয়া পণ্যের ডেলিভারি জট কাটাতে এক সপ্তাহের আলটিমেটাম দিয়ে বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিলামে কেনা পণ্য ডেলিভারি না নিলে পণ্য এবং বিডারের জামানত উভয়ই রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, নিলাম প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে আগ্রহী সবাই নিলামে অংশ নিতে পারেন এবং দীর্ঘদিনের জট নিরসন হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ হলো সমন্বয়ের অভাব ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা। আমদানিকারক, কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আদালতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় নিলাম প্রক্রিয়া আটকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ না নেওয়ায় পুরোনো কনটেইনার বছরের পর বছর জমে থাকছে। তারা মনে করেন, ডিজিটাল নিলাম ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং আইনি সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে হাজার হাজার কনটেইনার আটকে থাকলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কনটেইনার জটের কারণে নতুন পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে, বাড়ছে খরচ, আর এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে।

সব মিলিয়ে নিলাম না হওয়া ও ডেলিভারি আটকে থাকা কনটেইনার এখন চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্দরের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। এক সপ্তাহের আলটিমেটাম পরিস্থিতি কতটা বদলাতে পারবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সংশয় থাকলেও সবাই একমত—দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিলে এই জট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্রের রাজস্ব সুরক্ষা, বন্দরের সক্ষমতা রক্ষা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে নিলাম ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত