ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আবারও উত্তাল রাজপথ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শ্রমিকপাড়া—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে এই আন্দোলনের ঢেউ। বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন, বামপন্থি সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে এই বিক্ষোভের আয়োজন করেন। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে অভিবাসন নীতিকে ‘অমানবিক’, ‘বৈষম্যমূলক’ এবং ‘ভয়ের রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডসহ বিভিন্ন সূত্র এই আন্দোলনের খবর নিশ্চিত করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মিনিয়াপলিসে এক ফেডারেল এজেন্টের গুলিতে একজনের নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই দেশজুড়ে ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। অনেক আন্দোলনকারীর মতে, এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং অভিবাসনবিরোধী নীতির বাস্তব পরিণতির প্রতিফলন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার নামে আইসিইসহ বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তারা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছেন, যা নাগরিক অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

ওয়াশিংটন ডিসিতে মঙ্গলবার শত শত বিক্ষোভকারী জড়ো হন। কংগ্রেস ভবনের আশপাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তারা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেন। তাদের কণ্ঠে শোনা যায়, ‘নো আইসিই, নো কেকেকে, নো ফ্যাসিস্ট ইউএসএ’—একটি স্লোগান, যা অভিবাসন নীতি, বর্ণবাদ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ডে লিখে আনেন, ‘মানুষ অবৈধ নয়’, ‘শরণার্থীদের স্বাগত’ এবং ‘ভয় নয়, মানবতা চাই’।

শুধু রাজধানী শহরেই নয়, উত্তর ক্যারোলাইনার ছোট শহর অ্যাশভিলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নামেন। স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী এবং অভিবাসী পরিবারগুলো একসঙ্গে এই বিক্ষোভে অংশ নেন। অনেকেই বলেন, বড় শহরের বাইরে এমন ছোট শহরগুলোতে আন্দোলনের বিস্তার প্রমাণ করে যে অভিবাসন ইস্যুটি এখন আর সীমিত কোনো গোষ্ঠীর বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেও আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত বিক্ষোভে উচ্চারিত হয়, ‘ঘৃণা নেই, ভয় নেই, শরণার্থীরা স্বাগত’। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখতে হলে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতির বিরোধিতা করতেই হবে। নিউ মেক্সিকোর সান্তা ফেতে হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেয়, যা এই আন্দোলনের প্রজন্মগত ব্যাপ্তিকে স্পষ্ট করে।

সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটলসহ পশ্চিম উপকূলের অন্যান্য শহরেও বড় সমাবেশের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এসব শহরে আগে থেকেই অভিবাসনপন্থি আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলা না ঘটে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার তাদের নির্বাচনী ম্যান্ডেটের অংশ। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে এই অবস্থানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মনোভাব যে পুরোপুরি মিলছে না, তা সাম্প্রতিক বিভিন্ন মতামত জরিপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জরিপগুলোতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষ অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইসিই এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরোধী।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অভিবাসন নীতির নামে পরিবার বিচ্ছিন্ন করা, শিশুদের আটক কেন্দ্রে রাখা এবং ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছে; সেখানে এমন কঠোর নীতি শুধু অভিবাসীদের নয়, পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই বিক্ষোভগুলো কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অভিবাসন ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বরাবরই সংবেদনশীল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও বেশি মেরুকৃত হয়ে উঠেছে। একদিকে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার যুক্তি, অন্যদিকে মানবিকতা ও অধিকার—এই দুই অবস্থানের সংঘাতে রাজপথে নামছে সাধারণ মানুষ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখিয়ে দিচ্ছে যে অভিবাসন প্রশ্নে তারা একটি ভিন্ন, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক যুক্তরাষ্ট্র কল্পনা করছে। একই সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা আন্দোলনকে একটি বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলমান এই বিক্ষোভ শুধু একটি নীতির বিরোধিতা নয়; এটি মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচয় নিয়ে এক গভীর সামাজিক বিতর্কের প্রকাশ। এই আন্দোলন কোথায় গিয়ে থামে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এটুকু স্পষ্ট, অভিবাসন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজে যে আলোড়ন শুরু হয়েছে, তা সহজে প্রশমিত হওয়ার নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত