প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিস্ময়কর অগ্রগতিতে মানুষের জীবন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে কাজের পরিকল্পনা, কেনাকাটা, বিনোদন এমনকি ভাবনাচিন্তার বড় একটি অংশ এখন এআইচালিত যন্ত্র, অ্যাপ ও চ্যাটবটের ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তি মানুষের সময় বাঁচাচ্ছে, দক্ষতা বাড়াচ্ছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক ধরনের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি। সেই ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতেই অনেক মানুষ ঝুঁকছেন পুরোনো ধাঁচের, তুলনামূলক ধীর ও প্রযুক্তিনির্ভরতা কম জীবনের দিকে, যাকে বলা হচ্ছে ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’।
ডিজিটাল দুনিয়ার নিরবচ্ছিন্ন নোটিফিকেশন, স্ক্রলিংয়ের অভ্যাস, এআই দিয়ে তৈরি অসংখ্য প্রায় একই রকম কনটেন্ট অনেকের কাছেই এখন বিরক্তিকর। সহজে সবকিছু পেয়ে যাওয়ার এই জীবন একদিকে যেমন আরামদায়ক, অন্যদিকে তেমনি মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতা, ধৈর্য আর বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গাগুলোকে ফাঁপা করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। সেই শূন্যতাই মানুষকে ফিরিয়ে নিচ্ছে হাতে লেখা চিঠি, বই পড়া, সেলাই, বুনন, হাতে তৈরি শিল্পকর্ম কিংবা প্রযুক্তিবিহীন আড্ডার মতো পুরোনো অভ্যাসে।
প্রযুক্তিনির্ভরতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এই জীবনধারার নাম ‘অ্যানালগ লাইফস্টাইল’। এর মূল দর্শন হলো ধীরগতির জীবনযাপন, দৈনন্দিন কাজ নিজের হাতে করা এবং বিনোদনের জন্য বাস্তব ও সাধারণ উপায় খোঁজা। অ্যানালগ জীবন মানে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সচেতন দূরত্ব বজায় রাখা। দ্রুত সমাধানের বদলে সময় নিয়ে কিছু করার আনন্দই এখানে মুখ্য।
মানুষ কত দ্রুত অ্যানালগ জীবনের দিকে ঝুঁকছে, তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে নানা লক্ষণ বলছে, এই প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিল্পকলা ও হস্তশিল্প পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মাইকেলস জানিয়েছে, গত ছয় মাসে তাদের ওয়েবসাইটে ‘অ্যানালগ’ ধারার শখসংক্রান্ত পণ্য অনুসন্ধানের হার বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তাদের গাইডেড ক্রাফট কিটের বিক্রি বেড়েছে ৮৬ শতাংশ, আর চলতি বছরে তা আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, একসময় ‘দাদি–নানি যুগের শখ’ বলে পরিচিত বুনন ও হাতে সেলাইয়ের উপকরণগুলোর চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ শতাংশ। মাইকেলসের প্রধান মার্চেন্ডাইজিং কর্মকর্তা স্টেসি শিভেলি বলেছেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্রমাগত স্ক্রলিং থেকে বিরতি নেওয়া এবং মানসিক স্বস্তির খোঁজেই মানুষ হস্ত ও কারুশিল্পের দিকে ঝুঁকছে। তাঁর মতে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং এটি একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই প্রবণতা কেবল ভোক্তাদের আচরণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ভেতরেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সিএনএনের ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিবেদক রামিশাহ মারুফ নিজেই এই পরিবর্তন বোঝার জন্য এক পরীক্ষায় নেমেছিলেন। তিনি ৪৮ ঘণ্টার জন্য নিজের ডিজিটাল জীবন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এর অর্থ ছিল তিনটি আইফোন, একটি ম্যাকবুক, দুটি বড় ডেস্কটপ মনিটর, একটি কিন্ডল ও একটি অ্যালেক্সা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ রাখা। তাঁর ভাষায়, শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ প্রতিনিয়ত স্ক্রিনে ঢুঁ মারার যে অভ্যাস গড়ে উঠেছে, তা ভাঙা মোটেও সহজ নয়।
মারুফ লিখেছেন, অফলাইনে থাকার প্রথম দিনের সকালটি তাঁর জন্য তুলনামূলক সহজ ছিল। সূর্যের আলোয় ঘুম ভাঙা, ডায়েরি লেখা, পুরোনো বই পড়া—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল যেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর একটি জীবন অভিনয় করছেন। ডিজিটাল বিনোদনের অভাবে তাঁকে সময় কাটাতে হয়েছে হস্তশিল্প আর বইয়ের সঙ্গেই। দুই দিনের এই অভিজ্ঞতায় তিনি বুঝতে পেরেছেন, স্ক্রিনের বাইরে থেকেও জীবনে অর্থপূর্ণ অনেক কিছু করা সম্ভব।
এই অ্যানালগ জীবনধারার এক বাস্তব উদাহরণ কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ২৫ বছর বয়সী তরুণ শঘনেসি বার্কার। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে মোবাইল ফোন নয়, ল্যান্ডফোনে কল করতে হয় বা চিঠি লিখতে হয়। একসময় ইন্টারনেটের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ান ডিরেকশনের ভক্তদের অনলাইন কমিউনিটির মাধ্যমে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমে যায়। বার্কারের মতে, ইন্টারনেট এখন মূলত মুনাফার জন্য পরিচালিত, এখানে নিখাদ আনন্দের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
বার্কার নিজেকে গোড়া থেকে এআইবিরোধী বললেও তাঁর জীবন পুরোপুরি প্রযুক্তিবর্জিত নয়। ছোটবেলায় রেডিও, ভিনাইল রেকর্ড, ক্যাসেট ও ভিএইচএসে বড় হওয়া এই তরুণের কাছে এখনো এসব মাধ্যমের বিশাল সংগ্রহ আছে। তিনি প্রযুক্তি ছাড়াই ক্রাফট নাইট ও ওয়াইন নাইট আয়োজন করেন, হাতে নোট লেখেন এবং কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমা মেনে চলেন। তবে তিনিও স্বীকার করেন, আধুনিক দুনিয়ায় পুরোপুরি অনলাইন থেকে দূরে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাঁর শৈল্পিক দোকান কিংবা হাতে লেখা চিঠির ক্লাবের প্রচারের জন্য শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেটেরই সাহায্য নিতে হয়, যা তাঁর জীবনধারার সঙ্গে এক ধরনের সাংঘর্ষিক বাস্তবতা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানালগ জীবনের প্রতি এই ঝোঁকের পেছনে বড় একটি কারণ হলো এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের একঘেয়েমি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইডের এআই গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক অ্যাভরিয়েল এপস বলেন, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট শুধু ক্লান্তিকরই নয়, বরং মৌলিকতার অভাবে তা আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। তাঁর মতে, অ্যানালগ জীবনধারায় রূপান্তর মানে ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়, বরং ইন্টারনেটকে নিজের জীবন ও তথ্যের ওপর অযাচিত প্রভাব বিস্তার করতে না দেওয়া।
এপস নিজেও সম্প্রতি গুগল স্যুট ব্যবহার বন্ধ করেছেন এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো স্ক্রিন ছাড়াই কাটান। তাঁর ভাষায়, অ্যানালগ জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত—যেমন সাধারণ অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করা, ফিল্ম ক্যামেরায় ধীরে ছবি তোলা বা এআইচালিত প্ল্যাটফর্মের বদলে আইপডে গান শোনা—মানুষকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।
রামিশাহ মারুফের দুই দিনের অভিজ্ঞতার শেষদিকে তিনি অংশ নেন ব্রুকলিনের একটি লাইব্রেরিতে সাপ্তাহিক সেলাই আসরে। সেখানে নানা বয়সী নারীরা স্ক্রিন ছাড়াই সেলাইয়ের কৌশল আর রঙের ভাবনা ভাগাভাগি করছিলেন। তাঁদের সবারই অভিমত, হাতে কাজ করার এই অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। মারুফ নিজেও অনুভব করেন, স্ক্রিন থেকে দূরে থাকলে তাঁর হাতে অপ্রত্যাশিতভাবে অনেক সময় থাকে। তিনি বই শেষ করতে পারেন, আত্মীয়কে পোস্টকার্ড পাঠান এবং উপলব্ধি করেন—উজ্জ্বল নীল স্ক্রিনের বাইরেও জীবনের গভীরতা আছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সেই সহজতার মাঝেই একঘেয়েমি ও ক্লান্তি জন্ম নিচ্ছে। তার প্রতিক্রিয়ায় অ্যানালগ জীবনধারা হয়ে উঠছে এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। এটি প্রযুক্তিবিরোধী কোনো আন্দোলন নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি চেষ্টা।