ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তারদের শাস্তি প্রক্রিয়া শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানজুড়ে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। একই সঙ্গে নিরাপত্তার অজুহাতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে সরকার। এই পরিস্থিতি ইরানে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসন্ধান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই বলেন, ‘বর্তমান সংকটকালে বিচার বিভাগের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। যারা দয়ার যোগ্য নন, তাদের প্রতি নমনীয় হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি হবে।’ তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—সরকারবিরোধী বিক্ষোভে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।

এই ঘোষণার আগেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা হয়। রোববার স্বল্প সময়ের জন্য আংশিকভাবে ইন্টারনেট চালু হলেও পরে আবার অধিকাংশ ব্যবহারকারীর জন্য তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের দাবি, বিদেশি ‘উসকানিদাতা’ ও ‘ভুয়া তথ্য’ ছড়ানো ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ইন্টারনেট বন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো আন্দোলনের খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।

এর আগে বিচার বিভাগের প্রধান মোহসেনি-এজেই প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত যৌথ বিবৃতিতে তিন নেতা বলেন, তথাকথিত ‘খুনি, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাদের’ বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখানো হবে। তবে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে যারা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে, তারা চাইলে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘ইসলামি সহানুভূতি’ পেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার একদিকে কঠোর অবস্থান জানালেও অন্যদিকে বিভাজনের কৌশল নিয়েছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে। সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিক্ষোভকারীদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পশ্চিমা দেশগুলো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষই এই আন্দোলনের মূল কারণ।

এর মধ্যেই শনিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জানান, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার মানুষ’ নিহত হয়েছে। তবে তার দাবি, এসব প্রাণহানি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নয়; বরং বিদেশি শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী ও এজেন্টদের কারণে ঘটেছে। খামেনির এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, কারণ নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ও দায় কার—তা নিয়ে ইরানের সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যের বড় ধরনের অমিল রয়েছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ডাউনটাউন এলাকায় দোকানদারদের আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও পরবর্তীতে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

গ্রেপ্তারদের অনেককে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দ্রুত বিচার আইনের আওতায় অনেকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদ কিংবা বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ আনা হচ্ছে, যার শাস্তি হিসেবে দীর্ঘ কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

ইরানে এর আগেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কঠোর দমননীতি দেখা গেছে। ২০১৯ সালের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে হওয়া আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দাবি। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইরানকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের অধিকার রক্ষার দাবি তুলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ইন্টারনেট বন্ধ এবং গণগ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছে। তবে ইরান সরকার এসব সমালোচনাকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় পরীক্ষা। কঠোর দমননীতি স্বল্পমেয়াদে আন্দোলন দমাতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আরও ক্ষোভ ও অনাস্থা সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট, তরুণদের বেকারত্ব এবং মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা—এই সব সমস্যার সমাধান না হলে ইরানে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়া ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত