টাকার সংকটে ব্যাংক সংস্কার ধাপে ধাপে: গভর্নরের স্পষ্ট বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
টাকার সংকটে ব্যাংক সংস্কার ধাপে ধাপে: গভর্নরের স্পষ্ট বার্তা

প্রকাশ: ২১  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকট, অনিয়ম ও আস্থার ঘাটতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ঋণখেলাপির উচ্চ হার, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক ও ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এই খাতের চ্যালেঞ্জ এখন বহুমাত্রিক। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্ট ভাষায় জানালেন, টাকার ঘাটতি থাকায় একসঙ্গে সব দুর্বল ব্যাংক ঠিক করা সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে সংস্কারই এখন বাস্তবসম্মত পথ।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক লোক বক্তৃতায় গভর্নর এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটের চিত্র, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমাবদ্ধতার বাস্তব স্বীকারোক্তি। একই সঙ্গে তিনি দেন কিছু আশাবাদের বার্তাও—যেখানে ধীরে হলেও কাঠামোগত সংস্কারের ইঙ্গিত রয়েছে।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অতীতে কিছু খারাপ ব্যাংকের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে তাদের সহায়তা করতে হয়েছে। এতে সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। বর্তমানে টাকার ঘাটতি থাকায় একসঙ্গে সব দুর্বল ব্যাংককে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দিকে নজর দেওয়া হবে, এরপর ধাপে ধাপে বেসরকারি দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার করা হবে।

গভর্নরের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ব্যাংকিং খাত সংস্কারে তাৎক্ষণিক কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। বরং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক সিদ্ধান্তই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল। তিনি বলেন, “আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।”

ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে গভর্নর ছিলেন আরও কঠোর। তিনি জানান, ঋণ খেলাপি শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত না হলে কোনো ব্যাংকই ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে না। দুর্বল ব্যাংকগুলো কোনোভাবেই লভ্যাংশ দিতে পারবে না—এতে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে কঠোর সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য সম্পর্কে গভর্নর জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণ খেলাপির হার ৩০ শতাংশে এবং পরবর্তী বছরের মার্চের মধ্যে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার জন্য কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও বর্তমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়, তবুও তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নীতিগত সংস্কার ও নজরদারি বাড়ালে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেন গভর্নর। তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি রেখে বাকিগুলো মার্জ বা একীভূত করার পরিকল্পনা করছে। তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশে ১৫টির বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই।” আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ১২ থেকে ১৩টি ব্যাংককে কাঠামোগতভাবে ঠিক করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এই বক্তব্য ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।

ব্যাংক রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি শক্তিশালী রেজুলেশন ফার্ম গড়ে তুলতে চায়। এর জন্য ব্যাংকগুলোর অর্থায়নে একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ফান্ড চালু হলে সংকটের সময় সরকারকে আর সরাসরি অর্থ সহায়তা দিতে হবে না, বরং ব্যাংকিং খাত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংকট মোকাবিলা করতে পারবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ব্যাংক উদ্ধার প্রক্রিয়ায় সরকারের ওপর চাপ কমবে।

ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার পেছনের কারণ হিসেবে গভর্নর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দুর্বৃত্তায়ন, অনিয়ম, পরিবারতন্ত্র এবং সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যা পাচার হয়ে থাকতে পারে। এই মন্তব্য নতুন করে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—কারা এই অর্থের জন্য দায়ী এবং এত বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার পরও কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাতে কোনোভাবেই যেন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত প্রভাব না ফেলে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাংক পরিচালিত হতে হবে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়। সুশাসন নিশ্চিত না হলে ব্যাংকিং খাত কখনোই টেকসই হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়েও গভর্নরের বক্তব্য ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোপুরি স্বাধীন না হলেও বর্তমানে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। তবে ভবিষ্যতে এই স্বাধীনতা বজায় রাখা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর মতে, কার্যকর মুদ্রানীতি ও ব্যাংক তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংকিং খাত সংস্কার কঠিন হয়ে পড়বে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, দেশে রাজস্ব ফাঁকির প্রধান মাধ্যম হচ্ছে নগদ লেনদেন বা ক্যাশ। যদি বাংলাদেশকে ক্যাশলেস সোসাইটির দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। এই মন্তব্যে অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।

গভর্নরের বক্তব্য শুনে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, তাঁর বক্তব্যে বাস্তবতার স্বীকৃতি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে ভবিষ্যৎ সংস্কারের রূপরেখা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই পরিকল্পনাগুলো কতটা দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে। কারণ ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু আর্থিক নয়, এটি আস্থার সংকটও।

সব মিলিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুরের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, ব্যাংকিং খাতকে এক রাতের মধ্যে ঠিক করা সম্ভব নয়। টাকার ঘাটতি, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে ধাপে ধাপে সংস্কারই এখন একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। এই পথে কতটা সফলতা আসবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিনির্ধারকদের দৃঢ়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত