শুল্ক আতঙ্কে রুশ তেল কেনা বন্ধ করেছে ভারত: মার্কিন দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪২ বার
শুল্ক আতঙ্কে রুশ তেল কেনা বন্ধ করেছে ভারত: মার্কিন দাবি

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভারতের জ্বালানি নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক আরোপের পর ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এই দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও কূটনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে।

স্থানীয় সময় বুধবার (২১ জানুয়ারি) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্কট বেসেন্ট বলেন, ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর ভারত উল্লেখযোগ্য হারে রাশিয়ান তেল আমদানি শুরু করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নয়াদিল্লি মস্কোর কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয়। তাঁর ভাষায়, “এই শুল্ক সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর ভারত আর রাশিয়ান তেল কেনেনি।”

মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ইতোমধ্যেই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে ইউরোপের বহু দেশ রাশিয়ান তেল ও গ্যাস থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়। সেই শূন্যস্থান পূরণে ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশ তুলনামূলক কম দামে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়িয়ে দেয়।

ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর, কারণ দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লি বরাবরই বলে আসছে, তারা রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে কাজ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি ভারতের সেই অবস্থানকে চাপে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে অতিরিক্ত আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফলে মোট শুল্কের হার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। এই সিদ্ধান্ত ভারতের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাই ভারতকে রাশিয়ান তেল আমদানি বন্ধে বাধ্য করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা ও কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। অতীতেও রাশিয়ান তেল কেনার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। গত বছরের আগস্টে রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় নয়াদিল্লি এই পদক্ষেপকে “অন্যায় ও অযৌক্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছিল। ভারতের যুক্তি ছিল, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার এবং সে ক্ষেত্রে কোনো দেশকে একতরফাভাবে চাপ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

ভারতের কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করেছেন, দেশটির বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল কেনা সেই কৌশলেরই অংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শুল্ক আরোপের হুমকি ভারতের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনাধীন একটি নতুন বিল। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি বিলে সম্মতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জানিয়েছেন, শিগগিরই এই সংক্রান্ত বিল মার্কিন আইনসভায় পেশ করা হবে।

এই বিল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এটি সিনেটর গ্রাহামের উত্থাপিত একটি প্রস্তাব, যা বর্তমানে সিনেটে বিবেচনাধীন। তিনি আরও বলেন, বিলটি পাস হবে কি না, তা ভবিষ্যতে দেখা যাবে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাস—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে প্রেসিডেন্টের আলাদা কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।

এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ৫০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে তা কার্যত বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার সমান হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পদক্ষেপ শুধু ভারত নয়, বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থাকেও বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপ দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।

ভারতের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ান তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের রাশিয়ান তেল আমদানিতে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এটি কৌশলগত সাময়িক সিদ্ধান্ত নাকি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, রাশিয়ার জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ভারত ও চীন ছিল রাশিয়ার প্রধান তেল ক্রেতা। ভারত যদি সত্যিই আমদানি কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে, তবে মস্কোর রাজস্বে তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে রাশিয়া ইতোমধ্যেই বিকল্প বাজার ও লেনদেনের নতুন পদ্ধতি খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থ—এই তিনের টানাপোড়েনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন একটি অধ্যায় তৈরি হচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রীর দাবি সত্যি হোক বা না হোক, এটি স্পষ্ট যে রাশিয়ান তেল ইস্যু এখন আর শুধু জ্বালানি বা অর্থনীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত