১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টেক্সটাইল মিল বন্ধের ঘোষণা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টেক্সটাইল মিল বন্ধের ঘোষণা

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বস্ত্র ও সুতা উৎপাদন খাত এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান আর্থিক চাপ, ব্যাংকঋণের ভার, নীতিগত সহায়তার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অবশেষে চরম সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে শিল্পমালিকেরা। দেশের সুতা উৎপাদনকারী মিলগুলো রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজারে বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এ ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতারা ও বিভিন্ন মিলের প্রতিনিধিরা। তাঁদের বক্তব্যে ফুটে ওঠে শিল্পখাতটির চরম দুর্দশার বাস্তব চিত্র, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “আমরা বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের পক্ষে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।” তাঁর কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের স্পষ্ট ছাপ। তিনি জানান, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বাজারে সুতা ও বস্ত্রপণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় মালিকেরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

বিটিএমএ সভাপতি আরও বলেন, “আমাদের পুঁজি অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। ব্যাংকের টাকা শোধ করার কোনো বাস্তব উপায় নেই। সব সম্পত্তি বিক্রি করলেও দায় পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।” তাঁর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সংকটটি কেবল সাময়িক নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার ফল।

সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সমস্যা সমাধানে তারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে বারবার ধরনা দিলেও কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “আমরা সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে গিয়েছি। কিন্তু সবাই পিলো পাসিংয়ের মতো দায়িত্ব একে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে। বাস্তব কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না।” তাঁর মতে, এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই শিল্পখাতকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও সুতা শিল্প দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই খাতের ওপর নির্ভর করে লাখো শ্রমিকের জীবিকা এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। মিল বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শ্রমিক, পরিবহন খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিটিএমএ নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত নীতিগত সহায়তা ও শিল্পবান্ধব সিদ্ধান্ত না এলে পুরো খাত আরও গভীর সংকটে পড়বে। তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর বাড়তি চাপ শিল্পটিকে কার্যত অচল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা এখন অনেক মিলের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত একাধিক শিল্পনেতা বলেন, দেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকঋণের সুদহার পুনর্বিবেচনা, ঋণ পুনঃতফসিলের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত নিশ্চয়তা ছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

তাঁরা আরও বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের পেছনে দেশীয় সুতা ও বস্ত্রখাতের অবদান অনস্বীকার্য। এই খাত দুর্বল হয়ে পড়লে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিটিএমএ’র ঘোষিত কর্মসূচি সরকারের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। তাঁরা মনে করেন, শিল্পখাতের সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। নচেৎ, একের পর এক মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থান সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে বিটিএমএ নেতারা আবারও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যেন অবিলম্বে শিল্পখাতের সংকট নিরসনে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁরা বলেন, “আমরা সংঘাত চাই না, বন্ধ চাই না। আমরা চাই টিকে থাকতে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রক্ষা করতে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে। কিন্তু সহযোগিতা ছাড়া সেটা সম্ভব নয়।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব টেক্সটাইল মিল বন্ধের ঘোষণা শুধু একটি সংগঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য একটি গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সংকেতকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং কীভাবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত