দেশে স্বর্ণ-রুপা রেকর্ড দামে, কেন বাড়ছে বাজারদর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার
দেশে স্বর্ণ-রুপা রেকর্ড দামে, কেন বাড়ছে বাজারদর

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের মূল্যবান ধাতুর বাজারে আবারও রেকর্ড তৈরি হয়েছে। স্বর্ণ ও রুপা—উভয় ধাতুই এখন দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে। সর্বশেষ সমন্বয়ের পর শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দেশের বাজারে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নির্ধারিত নতুন দামেই স্বর্ণ ও রুপার বেচাকেনা চলছে। এই দামের ঊর্ধ্বগতি শুধু সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেই নয়, বরং বিনিয়োগকারী, স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহলেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ২৩ জানুয়ারি দুপুরে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের বা পিওর গোল্ডের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয় ৬ হাজার ২৯৯ টাকা। এর ফলে বর্তমানে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্বর্ণের অন্যান্য ক্যারেটের দামও একইভাবে বেড়েছে। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকায়, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকা। এই দামের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যুক্ত করতে হবে। গহনার নকশা ও মানভেদে মজুরির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

স্বর্ণের দামের এই উত্থান হঠাৎ করে হয়নি। এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি বাজুস এক দফা সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমিয়েছিল। সে সময় ভরিতে ৩ হাজার ১৪৯ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৮ টাকা। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট ও সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দামও কমানো হয়েছিল। তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়া হলো।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের বিপরীতে টাকার মানের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে স্বর্ণের বাজারে প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতির সুদের হার নীতি বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ১২ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ৩ দফায় কমানো হয়েছে। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল মোট ৯৩ বার, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বেড়েছিল এবং ২৯ বার কমেছিল। এত ঘন ঘন সমন্বয় স্বর্ণের বাজারকে একদিকে যেমন অস্থির করে তুলেছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তাও বাড়িয়েছে। অনেকেই এখন গহনা কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখছেন, আবার কেউ কেউ ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় আগেভাগেই স্বর্ণ কিনে রাখছেন।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাজুসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, স্বর্ণের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গত ২৩ জানুয়ারি রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। ভরিতে ৫২৫ টাকা বাড়িয়ে বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৮৮২ টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে রুপার সর্বোচ্চ দাম। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৫৩২ টাকায়, ১৮ ক্যারেটের দাম ৫ হাজার ৫৯৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ১৯৯ টাকায়।

রুপার বাজারেও চলতি বছর দামের ওঠানামা কম হয়নি। এখন পর্যন্ত ৯ দফা সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬ বার দাম বেড়েছে এবং ৩ বার কমেছে। আগের বছর ২০২৫ সালে রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল মোট ১৩ বার। এর মধ্যে ১০ বার দাম বেড়েছিল এবং মাত্র ৩ বার কমেছিল। যদিও স্বর্ণের তুলনায় রুপার বাজার অপেক্ষাকৃত ছোট, তবে শিল্প ও গহনা তৈরিতে রুপার ব্যবহার বাড়ায় এই ধাতুটির দামও ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান দামে সাধারণ ক্রেতাদের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে গহনা কেনার চাপ থাকলেও অনেকেই বাজেট কমিয়ে আনছেন অথবা হালকা ওজনের গহনার দিকে ঝুঁকছেন। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছেন। তাদের ধারণা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণের দামের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি মিশ্র বার্তা বহন করছে। একদিকে এটি বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে দেশের সংযোগের প্রতিফলন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গহনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগর ও ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। দাম বাড়লে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশে স্বর্ণ ও রুপার বর্তমান রেকর্ড দাম শুধু একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি এবং ভোক্তার আচরণের জটিল সমন্বয়। সামনে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং স্থানীয় মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে—এই মূল্যবান ধাতুগুলোর দাম আরও বাড়বে, নাকি কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত