নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১২৪ বার
নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। গাজা যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত এবং ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক আশঙ্কার মধ্যেই ইসরাইলে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ দুই প্রভাবশালী প্রতিনিধি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইসরাইল সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল গাজা পরিস্থিতি, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ এবং ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ।

হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে, এই বৈঠকে গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকি নিয়েও কথা হয়েছে। বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

যদিও এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল সম্পর্ক একদিকে যেমন কৌশলগতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে, অন্যদিকে মানবিক ইস্যুতে কিছুটা টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছে।

ইসরাইলি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানিয়েছে, এই সফরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের প্রধান জেনারেল ব্র্যাড কুপারও একই সময়ে ইসরাইলে পৌঁছেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ইসরাইলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে সম্ভাব্য সামরিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

ইসরাইলের চ্যানেল-১২ জানায়, জেনারেল কুপার ইসরাইলি চিফ অব জেনারেল স্টাফ ইয়াল জামির এবং বিমান বাহিনীর কমান্ডার টোমার বারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই বৈঠকগুলো এমন সময় হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও বিমান চলাচল নজরকাড়া হারে বেড়েছে।

গাজা প্রসঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়েও নানা জল্পনা চলছে। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এই পরিকল্পনায় গাজায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি, সীমিত প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি পক্ষ এবং অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আগেই সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বাস্তব সমাধান আসতে হলে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে ইরান ইস্যু এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সম্প্রতি তেহরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইরানের দাবি, ওয়াশিংটন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইল সফরে মার্কিন শীর্ষ প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ইরানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে নিজেদের জন্য প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সামরিক বিকল্পের কথাও একাধিকবার ইঙ্গিত আকারে সামনে এনেছে ওয়াশিংটন। তবে সরাসরি হামলা হলে তার প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতার আগুনে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এই বৈঠকের মানবিক দিকটিও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। গাজা যুদ্ধের ফলে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের সংকটে মানবিক বিপর্যয় দিন দিন গভীর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের কথাও বলছে। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অবস্থানের ভারসাম্য কতটা বজায় রাখা সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই বৈঠকের পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। একদিকে যুদ্ধ পরিচালনা, অন্যদিকে বন্দি বিনিময় ও যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তার সরকারের ভেতরেই মতভেদ দেখা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের এই বৈঠক শুধু একটি কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। গাজা যুদ্ধের পরিণতি, ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল সম্পর্কের নতুন অধ্যায়—সবকিছু মিলিয়ে এই বৈঠক বিশ্ব রাজনীতির নজরকাড়া এক মুহূর্ত হয়ে থাকল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com