আবারও পেছালো হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৫ বার

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। বহু প্রত্যাশিত এই মামলার তদন্ত অগ্রগতিতে ফের অনিশ্চয়তা তৈরি হলো। সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, আগামী ২৯ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন সময় নির্ধারণ করেছেন আদালত। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো পিছালো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত দিন, যা নিহতের পরিবার, সহকর্মী এবং রাজনৈতিক সহমর্মীদের মধ্যে হতাশা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

রোববার ২৫ জানুয়ারি ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার জন্য নতুন এ তারিখ নির্ধারণ করেন। এদিন প্রতিবেদন জমার কথা থাকলেও তদন্ত সংস্থা তা আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় আদালত নতুন দিন ধার্য করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক রুকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্ত সংস্থা সময়মতো প্রতিবেদন দিতে না পারায় আদালত তারিখ পিছিয়েছে।

এই মামলার তদন্ত শুরু থেকেই নানা জটিলতা ও বিলম্বে জড়িয়ে পড়েছে। এর আগে দুই দফা নির্ধারিত সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিবারই সময় বাড়ানোর আবেদন কিংবা তদন্তের অগ্রগতির ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বারবার সময় পিছোনোর ঘটনায় মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, একটি আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এমন দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।

শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন সাম্প্রতিক সময়ের এক পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবে মাঠের রাজনীতিতে তার সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার এই ঘোষণার পর থেকেই তিনি নিয়মিত গণসংযোগ ও প্রচার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগের সময় হাদি হামলার শিকার হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হঠাৎ করেই একদল দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় প্রথমে হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে এ মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের উল্লেখ করা হয়। পরে হাদির মৃত্যু হলে মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা যুক্ত করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ হত্যা মামলায় রূপ দেওয়া হয়। শুরুতে থানা পুলিশ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেলেও পরবর্তীতে তদন্তের ভার হস্তান্তর করা হয় গোয়েন্দা শাখা ডিবি পুলিশের কাছে। পরবর্তী সময়ে মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট, সিআইডিকে তদন্তে যুক্ত করা হয়।

তবে তদন্ত সংস্থা বদল হলেও তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা বারবার অভিযোগ করেছেন, ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাদের আশঙ্কা, সময় যত গড়াচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও তথ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তত বাড়ছে। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দেরি হওয়া মানেই শুধু বিচার বিলম্ব নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথও জটিল হয়ে ওঠা। ফৌজদারি আইনের একটি বহুল প্রচলিত নীতি হলো, বিলম্বিত বিচার কার্যত ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই এ ধরনের মামলায় তদন্ত সংস্থার ওপর সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা প্রত্যাশিত।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটি সংবেদনশীল হওয়ায় তদন্তে নানা দিক যাচাই করতে হচ্ছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য সংগ্রহ, এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণে সময় লাগছে। তবে তারা আশ্বাস দিচ্ছেন, নির্ধারিত নতুন সময়ের মধ্যেই আদালতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের চেষ্টা করা হবে।

হাদি হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং এটি সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। তার মৃত্যু অনেক তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি রাজনীতিতে সহিংসতার প্রশ্নটিকে আবারও সামনে এনেছে। নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করছে, এই মামলার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

এদিকে, আগামী ২৯ জানুয়ারি নির্ধারিত নতুন তারিখের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। সেদিন তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়বে কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা জল্পনা। নিহতের স্বজনরা বলছেন, তারা আর সময়ক্ষেপণ চান না। তাদের একটাই প্রত্যাশা, প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের আওতায় আসে এবং হাদির হত্যার নেপথ্যের সত্য উন্মোচিত হয়।

সব মিলিয়ে, হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বারবার পেছানো শুধু একটি মামলার প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়, এটি দেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনের শাসন নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নির্ধারিত নতুন সময়ের মধ্যে তদন্ত সংস্থা আদালতের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত