আমদানি বাড়ছে, তবু নাগালের বাইরে খেজুরের দাম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৪ বার
আমদানি বাড়ছে, তবু নাগালের বাইরে খেজুরের দাম

প্রকাশ:  ২৬  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শুল্কহার কমানো, আমদানি বাড়ানো—সব আয়োজনই ছিল সাধারণ মানুষের জন্য খেজুরের দাম সহনীয় করার লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খেজুরের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বাজারে খুচরা পর্যায়ে দাম কমেছে খুব সামান্যই। রমজান সামনে রেখে যখন খেজুরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, তখন সাধারণ ভোক্তার প্রশ্ন একটাই—আমদানি বাড়লেও খেজুরের দাম কমছে না কেন?

চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনেই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৬২৪ মেট্রিক টন খেজুর খালাস হয়েছে। এর আগে গত ছয় মাসে খালাস হওয়া খেজুরের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ হাজার মেট্রিক টনে। তুলনামূলকভাবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের সঙ্গে এটি প্রায় দ্বিগুণ। সরকার গত ২৩ ডিসেম্বর খেজুর আমদানির শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করার পর থেকেই আমদানির গতি বাড়তে শুরু করে। শুল্ক কমার আগে চট্টগ্রামের ফলমন্ডির আড়তগুলো ছিল অনেকটাই খালি, কিন্তু এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। আড়তগুলো খেজুরে ভরে উঠেছে, পাইকারি বেচাকেনাও বেড়েছে।

চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, শুল্ক কমানোর কারণে আমদানি বেড়েছে এবং তার প্রভাব পাইকারি বাজারে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কার্টনে খেজুরের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তবে এই কমতির সুফল পুরোপুরি খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজার এখনও স্থিতিশীল রয়েছে, বড় ধরনের অস্থিরতা নেই।

কাস্টমসের পরিসংখ্যানও আমদানি বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে খেজুর আমদানির পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৫৫৬ মেট্রিক টন, যা আগের বছর ২০২৪ সালে ছিল ৭৫ হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারির ২১ তারিখ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৭৭ মেট্রিক টন খেজুর। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, সংখ্যার হিসেবে আমদানি প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাজারে দামের প্রতিফলন সে অনুযায়ী হয়নি।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, শুল্ক কমানোর প্রভাব বাজারে পড়েছে এবং খেজুরের দাম এখন সহনশীল পর্যায়ে থাকার কথা। তাঁর মতে, শুল্ক কমানো হয়েছে, আমদানিও বেড়েছে, ফলে যৌক্তিকভাবে খেজুরের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। তবে তিনি স্বীকার করেন, বাজার মনিটরিং নিশ্চিত না হলে এর পুরো সুফল ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। চট্টগ্রামের ফলমন্ডির একাধিক আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা অভিযোগ করছেন, কিছু আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীর কারসাজির কারণে খেজুরের দাম কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না। মেসার্স এস বি এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. বখতিয়ার বলেন, মাশরুক খেজুর আগে যেখানে ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে এখন আমদানিকারক রেটই ধরা হচ্ছে ২২০০ টাকা। একইভাবে দাবাজ খেজুর আগে ৩৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন সেটি ৪২০০ টাকায় উঠেছে। তাঁর প্রশ্ন, আমদানি বাড়লে আর শুল্ক কমলে দাম কোথায় কমলো?

খুচরা বাজারের দিকেও তাকালে চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে অভিজাত মানের খেজুর মেডজুল ৫ কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার টাকায়, আজোয়া ৪ হাজার টাকা, মরিয়ম ৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে সাধারণ মানের খেজুর সাবাবী বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ টাকা, মাশরুক ২ হাজার ২০০ টাকা এবং সুককারী ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে। এসব দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এখনও বেশ চড়া।

চট্টগ্রামের ফলমন্ডির ফ্রেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ডাটর্স গ্যালারির মালিক শফিউল আজম টিপু বলেন, কাস্টমস শুল্ক কমলেও বাজারে খেজুরের দাম পুরোপুরি কমেনি। তবে তিনি আশাবাদী যে, প্রচুর আমদানি হওয়ায় রমজান মাসে খেজুর সহজলভ্য হবে এবং সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা হলেও কমতে পারে। অন্যদিকে মেসার্স নূরজাহান ট্রেডার্সের মালিক মো. ফয়সাল আহমেদ বলেন, মাশরুক খেজুরের দাম আগে ১৮০০-১৯০০ টাকা থাকলেও এখন ২২০০ টাকায় উঠে গেছে। মাব্রুম খেজুর ৪২০০-৪৫০০ টাকার জায়গায় এখন ৫ হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিছু আমদানিকারক আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও মিশরে খেজুরের দাম বেশি থাকার যুক্তি দেখিয়ে দেশীয় বাজারে দাম বাড়িয়ে রাখছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেজুরের দাম না কমার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল। বাংলাদেশে আমদানি করা খেজুর ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে অন্তত আটবার হাত বদল হয়। আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট, পাইকার, আড়তদার, পরিবহনকারী, খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি ধাপেই যোগ হয় মুনাফা ও অতিরিক্ত খরচ। ফলে শুল্ক কমলেও সেই সুবিধা ধাপে ধাপে ক্ষয়ে যায়।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রমজান মাসেই প্রয়োজন হয় ৮০ থেকে ৯০ হাজার মেট্রিক টন। এই বিপুল চাহিদাকে ঘিরেই এক ধরনের মৌসুমি বাজার তৈরি হয়, যেখানে সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করেন। বাজারে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে শুল্ক ছাড় ও আমদানি বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পায় না।

ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি নিয়মিত বাজার মনিটরিং, আমদানিকারক পর্যায়ে স্বচ্ছতা এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে খেজুরের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নইলে আমদানি বাড়ার খবর কাগজে থাকলেও বাজারে তার প্রভাব সীমিতই থেকে যাবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, খেজুরের আমদানি বাড়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। কিন্তু সেই আমদানির সুফল ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। রমজান সামনে রেখে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—ইফতারের এই অপরিহার্য খাদ্যটি যেন অন্তত নাগালের মধ্যেই থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত