প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টালিউডের বক্স অফিসে যেন হঠাৎ করেই অন্যরকম এক উন্মাদনা। বছরের শুরুতেই যে সিনেমাটি দর্শককে চমকে দিয়েছে, সমালোচকদের ভাবতে বাধ্য করেছে এবং প্রযোজকদের আত্মবিশ্বাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে—তা হলো ভৌতিক কমেডি চলচ্চিত্র ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’। সরস্বতী পূজার শুভ দিনে, গত ২৩ জানুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই একের পর এক রেকর্ড গড়ছে। দর্শকের উপস্থিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা এবং সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এটি এখন টালিউডের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম দিন থেকেই সিনেমাটির অধিকাংশ শো হাউজফুল যাচ্ছে। কলকাতার পাশাপাশি মফস্বলের প্রেক্ষাগৃহগুলোতেও দর্শকের ঢল নেমেছে। অনেক প্রেক্ষাগৃহে অতিরিক্ত শো যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছেন হল মালিকরা। দীর্ঘদিন পর একটি পারিবারিক বিনোদনধর্মী সিনেমাকে ঘিরে এমন উচ্ছ্বাস টালিউডে বিরল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ মূলত ভৌতিক আবহের মধ্যে কমেডির মিশেলে তৈরি এক রহস্যঘন পারিবারিক গল্প। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একটি পুরোনো হোটেল, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব ঘটনা, অতৃপ্ত আত্মার উপস্থিতি এবং মানুষের ভয়-ভালবাসার টানাপোড়েন। তবে সিনেমাটি শুধু ভয় দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হাসি, আবেগ ও রহস্যের এক সাবলীল মেলবন্ধন দর্শককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। এই ভারসাম্যই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
অরিত্র মুখার্জি পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে নির্মাতার পরিণত হাতের ছাপ স্পষ্ট। ভৌতিক গল্পকে হাস্যরসের মোড়কে উপস্থাপন করা সহজ কাজ নয়। অতিরিক্ত কমেডি গল্পের গভীরতা নষ্ট করতে পারে, আবার অতিরিক্ত ভয় দর্শকের স্বস্তি কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু পরিচালক সেই সূক্ষ্ম সীমারেখা অতিক্রম না করেই গল্প এগিয়ে নিয়েছেন। ফলে সিনেমাটি সব বয়সী দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
আইএমডিবিতে সিনেমাটির রেটিং বর্তমানে ১০-এর মধ্যে ৯.৪, যা টালিউডের জন্য এক অসাধারণ অর্জন। সাধারণত বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমাগুলো এত উচ্চ রেটিং পায় না। এই রেটিং প্রমাণ করে, দর্শক শুধু প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমাটি দেখছেন না, বরং তারা এটি ভালোবেসে গ্রহণও করছেন। উইন্ডোজ প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমার প্রতিটি শো প্রায় হাউজফুল থাকায় প্রযোজনা সংস্থাও দারুণ সন্তুষ্ট।
সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন জিনিয়া সেন ও গোধূলি শর্মা। গল্প বলার ধরনে রয়েছে নতুনত্ব, সংলাপে রয়েছে তীক্ষ্ণতা আর চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বতন্ত্রতা। প্রতিটি চরিত্র গল্পে আলাদা গুরুত্ব বহন করে, কেউই অপ্রয়োজনীয় মনে হয় না। ফলে দর্শক সহজেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন।
অভিনয়ের দিক থেকেও ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ প্রশংসার দাবি রাখে। প্রধান চার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিমি চক্রবর্তী, সোহম মজুমদার, বনি সেনগুপ্ত ও স্বস্তিকা দত্ত। মিমি চক্রবর্তী নন্দিনী চরিত্রে একদিকে যেমন সাবলীল, অন্যদিকে আবেগী দৃশ্যে তিনি দর্শকের মন ছুঁয়ে গেছেন। সোহম মজুমদার শাওন চরিত্রে তার কমেডি টাইমিং দিয়ে হাসির খোরাক জুগিয়েছেন। বনি সেনগুপ্ত অরণ্য চরিত্রে রহস্যময়তা বজায় রেখে গল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন, আর স্বস্তিকা দত্ত মালিনী চরিত্রে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন।
এ ছাড়া পার্শ্ব চরিত্রে কাঞ্চন মল্লিক, মানসী সিনহা, অনামিকা সাহা, উজান চট্টোপাধ্যায়, শ্রুতি দাস, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, রাজা গাঙ্গুলী, সুব্রাজিত দত্ত, প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য ও গুলশানারা খাতুনসহ আরও অনেকেই নিজ নিজ ভূমিকায় উজ্জ্বল। বিশেষ করে কাঞ্চন মল্লিকের উপস্থিতি দর্শকদের আলাদা করে আনন্দ দিয়েছে।
সিনেমাটির নির্মাণশৈলীও আলোচনায় এসেছে। ক্যামেরার কাজ, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং আবহসংগীত গল্পের ভৌতিক আবহকে আরও গভীর করেছে। অতিরিক্ত ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব লোকেশন ও সেট ডিজাইনের মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সিনেমাটি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা থামছেই না। ফেসবুক, এক্স ও ইনস্টাগ্রামে দর্শকরা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। অনেকেই লিখছেন, দীর্ঘদিন পর তারা পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে বসে উপভোগ করার মতো একটি বাংলা সিনেমা পেয়েছেন। কেউ কেউ আবার এটিকে টালিউডের ভৌতিক-কমেডি ঘরানার জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলে উল্লেখ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’-এর সাফল্য টালিউড ইন্ডাস্ট্রিকে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। বড় বাজেট, অতিরিক্ত তারকাবহুল সিনেমা না হয়েও যে ভালো গল্প, সঠিক নির্মাণ ও আন্তরিক অভিনয়ের মাধ্যমে বক্স অফিসে বাজিমাত করা যায়—এই সিনেমা তারই প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে, দর্শক এখনও নতুনত্ব ও মানসম্মত গল্পের অপেক্ষায় থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ শুধু একটি সফল সিনেমা নয়, বরং এটি টালিউডের জন্য এক আশাব্যঞ্জক বার্তা। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ফিরতি ঢল, ইতিবাচক সমালোচনা এবং বক্স অফিসের সাফল্য—সবকিছু মিলিয়ে এই সিনেমা এখন বাংলা চলচ্চিত্রের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সামনে দিনগুলোতে এই সাফল্য কত দূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।