প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে কিছু নাম সময়কে অতিক্রম করে অনুভূতির অংশ হয়ে যায়। পর্দায় তারা শুধু চরিত্র নন, হয়ে ওঠেন একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর নস্টালজিয়ার প্রতীক। সালমান শাহ ঠিক তেমনই এক নাম। প্রেক্ষাগৃহের আলো-আঁধারিতে তাঁর উপস্থিতি আজও দর্শকের চোখে জল আনে, মনে জাগায় নব্বইয়ের দশকের সেই রুচিশীল সিনেমার আবেশ। দীর্ঘদিন পর আবারও দেশের প্রেক্ষাগৃহে চলছে সালমান শাহ অভিনীত সিনেমা, যা নতুন করে প্রাণ ফিরিয়েছে ঢাকাই চলচ্চিত্রের স্মৃতিময় অধ্যায়ে।
লাইয়ন সিনেমাসের আয়োজনে পুরান ঢাকার বাবু বাজার ব্রিজ সংলগ্ন মাল্টিপ্লেক্সে শুরু হয়েছে বিশেষ আয়োজন ‘ফিরে দেখি সালমান শাহ’। এই আয়োজনে প্রদর্শিত হচ্ছে ক্ষণজন্মা এই নায়কের জনপ্রিয় তিনটি সিনেমা—‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘অন্তরে অন্তরে’ এবং ‘সত্যের মৃত্যু নেই’। নব্বইয়ের দশকে দর্শকপ্রিয় এই সিনেমাগুলো আবার বড় পর্দায় ফিরেছে আধুনিক প্রদর্শনী ব্যবস্থায়, যা পুরোনো দর্শকদের স্মৃতির দরজা খুলে দিচ্ছে, আর নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ঢালিউডের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে।
সালমান শাহ ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী স্টাইল আইকন। তাঁকে বলা হয় ‘আধুনিক ঢালিউডের প্রথম সুপারস্টার’ ও ‘অমর নায়ক’। মাত্র সাড়ে তিন বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে ঢাকাই সিনেমায় তাঁর রাজকীয় অভিষেক ঘটে। প্রথম সিনেমাতেই দর্শক বুঝে গিয়েছিল, পর্দায় এসেছে ভিন্ন কিছু—আধুনিক, সংবেদনশীল এবং রুচিশীল এক নায়ক।
নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমা তখন পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে। একদিকে ছিল বাণিজ্যিক ধারা, অন্যদিকে দর্শকের রুচি বদলের আকাঙ্ক্ষা। সালমান শাহ সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, চোখে-মুখে ছিল আবেগের গভীরতা, আর স্টাইলে ছিল শহুরে আধুনিকতার ছাপ। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বপ্নের নায়ক, যার মতো হতে চেয়েছিল অসংখ্য তরুণ, যার সংলাপ, পোশাক আর চুলের স্টাইল অনুকরণ করেছে একটি সময়।
‘ফিরে দেখি সালমান শাহ’ আয়োজন নিয়ে এক ভিডিওবার্তায় লায়ন সিনেমাস জানিয়েছে, সালমান শাহ কেবল একজন নায়ক নন, তিনি পুরো একটি প্রজন্মের অনুভূতি। আয়োজকদের ভাষায়, কিছু নায়ক সিনেমায় আসেন, আর কিছু নায়ক পুরো চিত্রজগত বদলে দেন—সালমান শাহ ঠিক সেই ধরনের সুপারস্টার, যার বিদায় আজও কাঁদায় লাখো সিনেমাপ্রেমীকে। এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা নতুন করে সেই আবেগকে প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন।
আয়োজকরা আরও জানান, এই বিশেষ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ২৩ জানুয়ারি এবং চলবে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন একটি করে সিনেমার দুটি শো প্রদর্শিত হচ্ছে। দর্শকদের আগ্রহ দেখে তারা আশাবাদী যে ভবিষ্যতে এমন আরও আয়োজন করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকদের মধ্যে সালমান শাহকে জানার যে কৌতূহল, এই আয়োজন তারই প্রতিফলন।
প্রদর্শিত সিনেমাগুলোর প্রতিটিই সালমান শাহর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ পরিচালনা করেছেন বাদল খন্দকার, যেখানে প্রেম আর জীবনের বাস্তবতার মিশেল দেখা যায়। ‘অন্তরে অন্তরে’, শিবলী সাদিক পরিচালিত, আজও প্রেমের সিনেমার তালিকায় আলাদা করে উচ্চারিত হয়। আর ছটকু আহমেদ পরিচালিত ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ তুলে ধরে সামাজিক অন্যায় ও নৈতিকতার প্রশ্ন। এই তিনটি সিনেমাই প্রমাণ করে, সালমান শাহ কেবল রোমান্টিক নায়ক ছিলেন না, বরং চরিত্রের গভীরতা ও গল্পের ভার বহন করার সক্ষমতাও তাঁর ছিল।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন সালমান শাহ। তাঁর অকাল মৃত্যু শুধু চলচ্চিত্র অঙ্গন নয়, পুরো দেশকেই শোকস্তব্ধ করে দেয়। আজও তাঁর মৃত্যুর সেই দিনটি ভক্তদের মনে গভীর বেদনা জাগায়। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু সালমান শাহকে ঘিরে দর্শকের আবেগ বদলায়নি। তাঁর সিনেমা টেলিভিশনে প্রচারিত হলে এখনও দর্শক থেমে যান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসে স্মৃতিচারণ, আলোচনা আর ভালোবাসা।
প্রেক্ষাগৃহে তাঁর সিনেমা পুনরায় প্রদর্শনের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং একটি স্মৃতির পুনর্জাগরণ। যেখানে দর্শক আবার বড় পর্দায় দেখতে পাচ্ছেন সেই চেনা হাসি, সংলাপ আর আবেগ, যা একসময় পুরো সিনেমাহল ভরিয়ে দিত। অনেক দর্শকের জন্য এটি তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ, আবার নতুন প্রজন্মের জন্য এটি ঢাকাই সিনেমার এক সোনালি অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জানালা।
চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে, এমন আয়োজন ঢাকাই সিনেমার ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডিজিটাল যুগে যেখানে কনটেন্টের অভাব নেই, সেখানে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে পুরোনো সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা মাত্রা যোগ করে। এটি দর্শককে সিনেমার মূল আবহের সঙ্গে যুক্ত করে, যা ছোট পর্দা বা মোবাইলে সম্ভব নয়।
সালমান শাহর সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে ফিরে আসা তাই কেবল অতীত স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি বার্তা। এটি প্রমাণ করে, ভালো গল্প, আন্তরিক অভিনয় আর সত্যিকারের তারকাখ্যাতি সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে। সালমান শাহ সেই অমরতার নাম, যিনি চলে গিয়েও থেকে গেছেন দর্শকের হৃদয়ে, বড় পর্দার আলোয়, আর বাংলা সিনেমার ইতিহাসে।