চাউন্দি দৈব বিতর্কে আইনি জটে রণবীর সিং

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১২ বার
চাউন্দি দৈব বিতর্কে আইনি জটে রণবীর সিং

প্রকাশ: ২৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা রণবীর সিং আবারও আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন। কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের অত্যন্ত পবিত্র ও প্রাচীন লোকদেবতা ‘চাউন্দি দৈব’-কে নিয়ে কটূক্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর হাই গ্রাউন্ডস থানায় এফআইআর দায়ের হয়েছে। আদালতের নির্দেশে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এই অভিযোগের সূত্রপাত গত বছরের ২৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে। সেদিন গোয়ায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অফ ইন্ডিয়ার সমাপনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রণবীর সিং। অনুষ্ঠানে দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় ছবি ‘কান্তারা: চ্যাপ্টার ১’-এর অভিনেতা ঋষভ শেঠিও উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে রণবীর সিং কর্ণাটকের লোকজ ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত ‘পাঞ্জুরলি’ বা ‘গুলিকা দৈব’-এর দৈব অভিব্যক্তি কুরুচিকরভাবে নকল করেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি ‘চাউন্দি দৈব’-কে এক ‘নারী ভূত’ বা female ghost হিসেবে উল্লেখ করেন, যা উপস্থিত অনেক দর্শক ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত মানুষের কাছে চরম আপত্তিকর বলে বিবেচিত হয়।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আচরণ চলাকালীন ঋষভ শেঠি নাকি রণবীরকে একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন এবং এমন কটাক্ষমূলক আচরণ বন্ধ করতে অনুরোধ করেছিলেন। তবে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই রণবীর তাঁর মন্তব্য ও অঙ্গভঙ্গি চালিয়ে যান। বিষয়টি তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।

এই ঘটনায় ব্যক্তিগত অভিযোগ দায়ের করেন বেঙ্গালুরুর আইনজীবী প্রশান্ত মেথাল। তিনি দাবি করেন, চাউন্দি দৈব তাঁর পারিবারিক দেবতা এবং এটি কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাচীন ‘ভূত কোলা’ রীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ভাষায়, চাউন্দি দৈব কোনো ‘ভূত’ নন, বরং তিনি ন্যায়, সুরক্ষা ও নারীর শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত এক দেবীসত্তা। অভিযোগে বলা হয়েছে, রণবীর সিং ইচ্ছাকৃতভাবে এবং বিদ্বেষমূলক মনোভাব নিয়ে এই ঐতিহ্যকে অপমান করেছেন, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

প্রশান্ত মেথাল বলেন, “চাউন্দি দৈবকে ভূত বলা শুধু অজ্ঞতার পরিচয় নয়, এটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর। উপকূলীয় কর্ণাটকের মানুষের কাছে এই দৈব বিশ্বাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত হয়ে আসছে। একজন জাতীয় পর্যায়ের অভিনেতা হিসেবে রণবীর সিংয়ের কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ কখনোই প্রত্যাশিত নয়।”

আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ওই আইনজীবী আদালতের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি পর্যালোচনা করে গত ২৩ জানুয়ারি বেঙ্গালুরুর একটি আদালত হাই গ্রাউন্ডস থানাকে রণবীর সিংয়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেয়। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ১৯৬, ২৯৯ ও ৩০২ ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই ধারাগুলো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, উপাসনার স্থানে অবমাননা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৮ এপ্রিল বেঙ্গালুরুর ফার্স্ট অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে রণবীর সিংয়ের জন্য বিষয়টি আইনি ও ভাবমূর্তির দিক থেকে বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

উল্লেখযোগ্য যে, গত বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘কান্তারা’ ছবির মাধ্যমে কর্ণাটকের উপকূলীয় অঞ্চলের ‘ভূত কোলা’ ও দৈব সংস্কৃতি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ছবিটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে চাউন্দি দৈব, পাঞ্জুরলি, গুলিকা দৈবসহ নানা লোকদেবতার নাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠে। এমন এক প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহ্যকে নিয়ে প্রকাশ্যে ‘মজা’ বা কটাক্ষ করাকে অনেকেই সংস্কৃতি অবমাননা হিসেবে দেখছেন।

এদিকে রণবীর সিংয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আদালতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে অনেকে রণবীরের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে নিন্দা করছেন, অন্যদিকে তাঁর কিছু ভক্ত এটিকে ‘অযথা বিতর্ক’ হিসেবেও দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—জনপ্রিয় তারকারা প্রকাশ্য মঞ্চে কথা বলার সময় কতটা সংবেদনশীল হওয়া উচিত। ভারতের মতো বহুধর্ম ও বহুসংস্কৃতির দেশে একটি মন্তব্যও কীভাবে বড় ধরনের বিতর্ক ও আইনি জটিলতার জন্ম দিতে পারে, রণবীর সিংয়ের ঘটনা তারই একটি উদাহরণ।

সব মিলিয়ে, চাউন্দি দৈব বিতর্ক রণবীর সিংয়ের ক্যারিয়ারে নতুন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। আদালতের রায় কী হয়, তা ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে এই অভিযোগ কতটা গুরুতরভাবে বিবেচিত হবে। তবে আপাতত বলা যায়, দক্ষিণ ভারতের একটি প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এই মামলা বলিউডের জন্যও এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত