প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সব ধরনের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের পাশাপাশি এখন থেকে মেয়াদি আমানতের বিপরীতেও গ্রাহকরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আগামী ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত মুনাফা তোলার সুযোগও চালু হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এসব তথ্য জানান, যা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন থাকা লাখো আমানতকারীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
গভর্নর বলেন, বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা যেকোনো স্কিম থেকেই সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন এবং এই সুবিধা পর্যায়ক্রমে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স ও সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে প্রাপ্য মুনাফা তাৎক্ষণিকভাবে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই—আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।”
সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নানা গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে গভর্নর এই বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, একটি দুষ্টুচক্র ইচ্ছাকৃতভাবে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে। ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে এসব অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, সরকারের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নজরদারিতে এই ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, কোনো পরিকল্পনাই শতভাগ নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা চিহ্নিত হয় এবং তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমরা ধাপে ধাপে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছি এবং সমাধানে কাজ করছি। কিন্তু কিছু মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই একীভূত কার্যক্রম ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।”
গভর্নরের বক্তব্যে সবচেয়ে জোরালো আশ্বাসটি ছিল আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, যত অপপ্রচারই হোক না কেন, সব আমানতকারীর মূল আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ। কোনো আমানত হারানোর আশঙ্কা নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে এবং আগেও এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “আমানতকারীদের ধৈর্য ধরতে হবে, কারণ আমরা দায়িত্ব নিয়ে এবং পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছি।”
মুনাফার হার নিয়েও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন গভর্নর। তাঁর ভাষ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকেই সম্পূর্ণ বাজারদরে মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। এক বছরের বেশি মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এক বছরের কম মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ। এটি বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি প্রতিযোগিতামূলক হার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিনি আরও জানান, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। দুই বছরের জন্য ৪ শতাংশ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যার ফলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। গভর্নর বলেন, “এই সহায়তার অর্থই প্রমাণ করে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের বিষয়ে কতটা আন্তরিক।” তাই তিনি সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে অফিসিয়াল ঘোষণার ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের পটভূমিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়ে। এসব ব্যাংককে একীভূত করেই সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে, যাতে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়।
এই পাঁচটি ব্যাংকে মোট প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণ, যার মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি। এই বিপুল খেলাপি ঋণই ব্যাংকগুলোর সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গভর্নর বলেন, এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সংকট মানেই শেষ নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গভর্নরের এই বক্তব্য বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যারা আতঙ্কে ছিলেন, তাদের জন্য এটি একটি শক্ত বার্তা যে রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পাশে আছে। একই সঙ্গে নিয়মিত মুনাফা তোলার সুযোগ চালু হওয়ায় অনেক আমানতকারী আবারও ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে পাবেন।
সংবাদ সম্মেলন শেষে গভর্নর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি রাতারাতি শেষ হবে না। তবে প্রতিটি ধাপেই স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই না কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। এই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের সব সিদ্ধান্ত।”
সব মিলিয়ে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য এই ঘোষণা শুধু আর্থিক স্বস্তিই নয়, বরং মানসিক নিরাপত্তাও এনে দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার মধ্যে এই ধরনের স্পষ্ট ও আশ্বাসমূলক বক্তব্য অনেকের কাছেই নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।