প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আর্থিক খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের ব্যাংক হিসাব তলবের ঘটনা। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গতকাল সোমবার দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদের পাশাপাশি তার স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যানের পাশাপাশি তার স্ত্রী মর্জিনা বেগম, দুই পুত্র—জুন্নুন সাফওয়ান ও জুনায়েদ জুলাকারনায়েন টিয়ান এবং কন্যা তাসমিয়া তারান্নুম নওমির নামে কোনো ব্যাংক হিসাব থাকলে তার বিস্তারিত, এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবও সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। হিসাব খোলার ফরম, লেনদেন বিবরণী, কেওয়াইসি (Know Your Customer), লকার, সঞ্চয়পত্র, কার্ড ও গিফট কার্ডসহ যাবতীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে।
এই পদক্ষেপকে অনেকেই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখছেন। কারণ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর থেকেই, সেই সরকারের সময় লাভবান বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। আওয়ামী লীগের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই ব্যাংকারকে সেই সময় ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্ট বলেও দাবি ছিল বিভিন্ন মহলে।
সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে পুনর্গঠন করে এবং সেখানেই ওবায়েদ উল্লাহকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে তার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে ব্যাংকিং সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে আলোচনা তীব্র হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় নতুন একজন চেয়ারম্যান নিয়ে আসতে, যেখানে ইসলামী ব্যাংকের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব একজনকে নিয়োগ দিতে চাপ সৃষ্টি করছে। এমন জটিল অবস্থার মাঝেই বিএফআইইউর পক্ষ থেকে ওবায়েদ উল্লাহ ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব তলবের ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনাকে শুধুই নিয়মিত আর্থিক তদারকির অংশ হিসেবে দেখছেন না অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত স্পষ্ট। আবার কেউ কেউ এটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘সতর্ক সংকেত’ বলেও অভিহিত করছেন।
সব মিলিয়ে, ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, বরং নতুন শাসনব্যবস্থার অধীনে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে এর শেষ কোথায় এবং পরিণতি কী দাঁড়ায়, তা সময়ই বলে দেবে।