প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ যত গভীর হচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার। দেশের এক কোটিরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্রমণের কারণে প্রতিদিনই বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন বাড়ছে। ফলে ডলার, ইউরো, পাউন্ড কিংবা রুপি—প্রতিটি মুদ্রার বিনিময় হার এখন সাধারণ মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক সূচকে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে ২০২৬) দেশের ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্য, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপের মধ্যেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজকের বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডলারের দামের ওঠানামা আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং প্রবাসী আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে ডলারের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা ইউরোর দামও বেশ উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। আজ প্রতি ইউরোর ক্রয় মূল্য ১৪৩ টাকা ৩৪ পয়সা এবং বিক্রয় মূল্য ১৪৩ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ফলে ইউরোর দামের পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলছে প্রবাসী পরিবারগুলোর ওপর।
ব্রিটিশ পাউন্ডের দামও আগের মতোই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রতি পাউন্ডের ক্রয় মূল্য ধরা হয়েছে ১৬৫ টাকা ৩৮ পয়সা এবং বিক্রয় মূল্য ১৬৫ টাকা ৪৫ পয়সা। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য এই হার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং অভিবাসীদের জন্য পাউন্ডের দামের পরিবর্তন অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখে।
এদিকে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রাগুলোর মধ্যেও কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। জাপানি ইয়েনের ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য উভয়ই ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, মেট্রোরেল এবং বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ থাকায় ইয়েনের বিনিময় হারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিঙ্গাপুর ডলারের ক্ষেত্রেও স্থিতিশীল প্রবণতা দেখা গেছে। আজ প্রতি সিঙ্গাপুর ডলারের ক্রয় মূল্য ৯৫ টাকা ৭৭ পয়সা এবং বিক্রয় মূল্য ৯৫ টাকা ৮২ পয়সা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী ও ব্যবসায়ী অবস্থান করছেন। ফলে দেশটির মুদ্রার দামের ওঠানামা বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনেও প্রভাব ফেলছে।
অস্ট্রেলিয়ান ডলারের ক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৭ টাকা ৩৫ পয়সা এবং বিক্রয় মূল্য ৮৭ টাকা ৩৬ পয়সা। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়ার কারণে এই মুদ্রার প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় নির্ধারণে অস্ট্রেলিয়ান ডলারের হার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।
চীনের মুদ্রা ইউয়ানের ক্রয় মূল্য ১৭ টাকা ৯২ পয়সা এবং বিক্রয় মূল্য ১৭ টাকা ৯৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে ইউয়ানের বিনিময় হার এখন ব্যবসায়ীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানি এবং প্রযুক্তি খাতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ার ফলে ইউয়ানের ব্যবহারও বেড়েছে।
ভারতীয় রুপির ক্রয় ও বিক্রয় মূল্য উভয়ই ১ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক আমদানি-রপ্তানি, চিকিৎসা ও পর্যটন খাতের সম্পর্কের কারণে রুপির বিনিময় হার প্রতিদিন হাজারো মানুষের আর্থিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী রাখা জরুরি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে যেকোনো সময় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী মুদ্রার বিনিময় হার প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বশেষ হালনাগাদ হার জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্ব যত বাড়ছে, ততই সাধারণ মানুষের কাছে বৈদেশিক মুদ্রার হার একটি দৈনন্দিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। তাই প্রতিদিনের মুদ্রাবাজারের এই পরিবর্তন এখন কেবল ব্যাংকার বা ব্যবসায়ীদের নয়, বরং দেশের লাখো পরিবারের জীবনযাত্রার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।