চামড়া সংরক্ষণে বাড়বে অর্থনীতির গতি: কৃষিমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ২ বার
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র কুরবানির ঈদকে ঘিরে প্রতি বছর দেশে বিপুল পরিমাণ পশু জবাই হয়। সেই সঙ্গে তৈরি হয় বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও। কুরবানির পশুর মাংসের পাশাপাশি চামড়া, হাড়, চর্বি ও অন্যান্য উপজাত সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, কুরবানিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়বে, একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে আয়োজিত ‘কুরবানি বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী। কর্মশালায় মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী, চামড়া সংরক্ষণকারী, ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে কুরবানির পশু ব্যবস্থাপনা, চামড়া সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন কুরবানিযোগ্য পশু উৎপাদনে প্রায় পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশীয় খামারিরা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে যে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছেন, তা দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম। এই অর্জন শুধু কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সাফল্য। তিনি বলেন, কুরবানির সময় দেশে লাখ লাখ পশু জবাই হয় এবং এ সময়টিকে ঘিরে অস্থায়ীভাবে হলেও বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পশু পরিবহন, হাট ব্যবস্থাপনা, জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া সংরক্ষণ ও বিপণনের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ যুক্ত থাকেন।

আমিন উর রশিদ বলেন, কুরবানির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পশুর চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা। দেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায় শুধুমাত্র দক্ষতার অভাব এবং সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি না জানার কারণে। এতে একদিকে যেমন চামড়ার গুণগত মান কমে যায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশের চামড়াশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে। তিনি বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া ভালো মানের চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে চামড়া ছাড়ানোর মতো সংবেদনশীল কাজে দক্ষতার অভাব থাকলে পুরো চামড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং তরুণদের এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে তারা স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে চামড়ার গুণগত মানও উন্নত হবে। সরকার এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের চিন্তা করছে বলেও তিনি জানান। প্রয়োজনে সারা বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে কুরবানির মৌসুমে দক্ষ জনবলের সংকট না থাকে।

অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কুরবানির চামড়ার বড় একটি অংশ মাদ্রাসায় দান করা হয়। তাই চামড়া সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ সরবরাহসহ বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে। সঠিকভাবে চর্বি পরিষ্কার করা, নির্ধারিত মাত্রায় লবণ ব্যবহার এবং দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে চামড়ার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।

চামড়াশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে পরিচিত। একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের বড় অবদান ছিল। কিন্তু নানা সংকট, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, ট্যানারি স্থানান্তর এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ শিল্পে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কুরবানির সময় সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করা গেলে আবারও এ খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, দেশে যখন পর্যাপ্ত পশু উৎপাদন হচ্ছে, তখন অবৈধ বা চোরাই পথে আসা পশু কেনার কোনো যৌক্তিকতা নেই। জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কুরবানির সময় শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চামড়া সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তিনি মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সচেতন হওয়ার আহ্বানও জানান।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, কুরবানির সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পশু ব্যবস্থাপনা ও চামড়া সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো গেলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

কুরবানিকে ঘিরে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ব্যাপক গতি আসে। খামারি, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এই সময়ের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে কুরবানির পশুর সঠিক ব্যবস্থাপনা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত