প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নওগাঁর রাণীনগরে আকস্মিক বজ্রপাতে দাদা-নাতিসহ তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। বৃহস্পতিবার (২১ মে) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার পৃথক দুটি স্থানে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিকাজ ও গবাদিপশু আনতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই তিনজনের মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল, গ্রামীণ জনপদে বজ্রপাত এখন কতটা ভয়াবহ ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
নিহতরা হলেন উপজেলার পারইল ফকিরপাড়া গ্রামের মৃত আসাদ ফকিরের ছেলে আক্কাস ফকির (৫৮), তার নাতি আমিনুরের ছেলে তারেক ফকির (২৪) এবং গুয়াতা আটনিতাপাড়া গ্রামের হাশেম তালুকদারের ছেলে নয়ন তালুকদার (২৬)। আক্কাস ফকির ও তারেক ফকির সম্পর্কে দাদা-নাতি ছিলেন। তাদের একসঙ্গে মৃত্যু পরিবারের ওপর যেন এক অসহনীয় শোকের বোঝা হয়ে নেমে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে পারইল গ্রামের জ্যাঠা মাঠে অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে ধান কাটার কাজ করছিলেন আক্কাস ফকির ও তার নাতি তারেক। আকাশ মেঘলা থাকলেও জীবিকার তাগিদে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার অবনতি ঘটে এবং হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই দাদা-নাতির মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর মাঠে থাকা অন্য শ্রমিক ও স্থানীয়রা ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। তবে ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই দুটি প্রাণ নিভে যাওয়ার দৃশ্য উপস্থিত মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
অন্যদিকে একই সময়ে উপজেলার গুয়াতা আটনিতাপাড়া গ্রামে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। স্থানীয় যুবক নয়ন তালুকদার বৃষ্টির সময় মাঠ থেকে গরু আনতে বের হন। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করলেও দীর্ঘ সময় তিনি বাড়ি ফিরে না আসায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিকেলের দিকে স্থানীয়রা মাঠে গিয়ে তাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন, বজ্রপাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে খোলা মাঠে কৃষিকাজ করা মানুষ এবং গবাদিপশু নিয়ে চলাচলকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকছেন। অনেক সময় আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে মানুষ নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগও পান না।
রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া মণ্ডল জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
গ্রামীণ জনপদে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু এখন একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামার কারণে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। বিশেষ করে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, বড় গাছের নিচে অবস্থান কিংবা জলাশয়ের আশপাশে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু গ্রামীণ বাস্তবতায় জীবিকার প্রয়োজনে অনেক মানুষ ঝুঁকি নিয়েই মাঠে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে প্রতি বছরই বজ্রপাতে বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
নওগাঁর এই মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয়দের মনে গভীর দাগ কেটেছে। বিশেষ করে একই পরিবারের দাদা-নাতির একসঙ্গে মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকাহত করে তুলেছে। স্বজনদের আহাজারি আর গ্রামের মানুষের বিষণ্ন মুখ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির এক ঝলক ভয়াবহতা কত সহজেই কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন।
স্থানীয়দের দাবি, বজ্রপাত মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থা এবং আগাম সতর্কতা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।