যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে সংসদে কেউ মুখ খোলেনি: রুমিন ফারহানা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে সংসদে কেউ মুখ খোলেনি: রুমিন

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি, বিরোধী মতের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেছেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে যে একদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষায়, রাজনৈতিক দল পাল্টালেও সংসদের কার্যক্রমে বিরোধী মত ও কার্যকর বিতর্কের যে ঘাটতি, তা এখনো দূর হয়নি।

মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্টস ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস নামের একটি সংগঠনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। সেখানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংসদের ভূমিকা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য তুলে ধরেন বিএনপির সাবেক এই নেত্রী ও বর্তমান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।

রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশে বহু বছর ধরে কার্যত একদলীয় সংসদীয় সংস্কৃতি চালু রয়েছে। আগে বিএনপি-জামায়াতকে সংসদের বাইরে রেখে সংসদ পরিচালিত হয়েছে, এখন আওয়ামী লীগ ও বামপন্থি দলগুলোকে বাইরে রেখে নতুন বিন্যাসে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো কার্যকর বিরোধী মত এবং সংসদে শক্তিশালী বিতর্ক; কিন্তু বাস্তবে সেই চর্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, সংসদে প্রবেশের প্রথম দিন থেকেই তিনি এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলে আসছেন। সংসদে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সংসদ সদস্যদের আগ্রহ কমে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি প্রসঙ্গে তিনি যে অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, তা উপস্থিত অনেকের মধ্যেই আলোচনার জন্ম দেয়।

রুমিন ফারহানার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা বাণিজ্যচুক্তি দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি খাত, শ্রমবাজার ও বৈদেশিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সংসদে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে গিয়ে তিনি কার্যত একা হয়ে পড়েন। সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী একটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য স্পিকারের কাছে নোটিশ দিতে কমপক্ষে পাঁচজন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি সেই সমর্থন পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হয়।

তার এই বক্তব্য সংসদীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকলে সংসদের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন, বাণিজ্যনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুষ্ঠানে রুমিন ফারহানা স্বাস্থ্য খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। দেশে হামের প্রকোপ বাড়তে থাকা প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুললে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাকে এ বিষয়ে বেশি কথা না বলতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, জনগণকে আতঙ্কিত না করার যুক্তি দেখিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাকে সীমিত রাখার চেষ্টা হয়েছিল। তবে তিনি মনে করেন, জনস্বাস্থ্য সংকটের মতো বিষয়ে তথ্য গোপন না করে বরং জনগণকে সচেতন করাই সরকারের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, বর্তমান যুগে তথ্য গোপন করে কোনো বাস্তবতা আড়াল করা সম্ভব নয়। মানুষের হাতে এখন স্মার্টফোন রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়া।

দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আগে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন এলাকায় তেলের সংকট তৈরি হয়েছিল। মোটরসাইকেল চালক, পরিবহন শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। কিন্তু দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পরপরই বাজারে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যেতে শুরু করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তেল এতদিন কোথায় ছিল?

তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে জনগণের উদ্বেগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও বাজার অস্থিরতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠছে।

অনুষ্ঠানে রুমিন ফারহানা আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় তথ্য গোপন বা বাস্তবতা আড়াল করার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। তিনি মনে করেন, জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব। তাই শুধুমাত্র প্রচারণা দিয়ে বাস্তবতা বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সরকারের উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর সংসদীয় বিতর্ক নিশ্চিত করা।

তার বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে সংসদে কার্যকর বিরোধী কণ্ঠের প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, সংসদে সক্রিয় ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি শক্তিশালী না হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী মতের অংশগ্রহণ, সংসদীয় কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সামনে আসায় সংসদের ভূমিকা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশাও বাড়ছে। রুমিন ফারহানার বক্তব্য সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত