রেমিট্যান্সে নতুন গতি, ১৯ দিনেই এলো ২৪৮ কোটি ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
রেমিট্যান্সে নতুন গতি, ১৯ দিনেই এলো ২৪৮ কোটি ডলার

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আবারও আশার আলো জাগাচ্ছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ। চলতি মে মাসের প্রথম ১৯ দিনেই দেশে এসেছে ২৪৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বুধবার (২০ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, চলতি মাসের প্রথম ১৯ দিনে দেশে এসেছে ২৪৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৭৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দৈনিক গড়ে দেশে এসেছে প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ মে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ১৮১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার তুলনামূলক আকর্ষণীয় হওয়া এবং সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রমের কারণেই রেমিট্যান্স প্রবাহে এই ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে প্রবাসী আয়ের অবদান বাড়ছে।

গত কয়েক মাসের ধারাবাহিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক গতি বজায় রয়েছে। গত এপ্রিলে দেশে এসেছে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার। মার্চ মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড গড়ে। ফেব্রুয়ারিতে দেশে আসে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং জানুয়ারিতে আসে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এছাড়া গত ডিসেম্বরে আসে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার এবং নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি বেশ চাপের মুখে ছিল। সেই পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে। দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমশক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশগামী কর্মীদের আয়ও আগের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠালে নগদ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিও ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রবাসীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা অর্থ পাঠানোর সময় নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত লেনদেন ব্যবস্থা, কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ এবং প্রবাসীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তারা বলছেন, রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, দেশের পরিবারের সদস্যদের ভালো রাখার জন্য তারা কঠোর পরিশ্রম করে বিদেশে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকেই নির্মাণশ্রমিক, চালক, কারখানাকর্মী কিংবা সেবা খাতের নানা কাজে নিয়োজিত থেকেও নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন দেশে। তাদের এই অবদান দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মোকাবিলা, জ্বালানি খাতের অর্থ পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও সরকারের সক্ষমতা বাড়বে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় যখন অনেক উন্নয়নশীল দেশ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ধরে রাখতে প্রবাসীদের এই অবদানকে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত