প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থায় আবারও যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধ। দীর্ঘ ছয় বছর আগে এই শর্তটি বাদ দেওয়ার পর এবার তা পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন রাজনৈতিক সরকারের নীতিগত দিকনির্দেশনার পর পাসপোর্ট নীতিতে ব্যাপক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নথিতে বাংলাদেশের অবস্থানগত বার্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সব ধরনের পাসপোর্টে ধাপে ধাপে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ যুক্ত করা হবে।
এই বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। বৈঠকে পাসপোর্ট ডিজাইন, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য এবং জলছাপ পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হয়। নীতিনির্ধারকদের মতে, পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়, বরং এটি একটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীকও বহন করে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চালু হওয়া ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার সময় ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। বিভিন্ন সময় পুনরায় এই শব্দ যুক্ত করার দাবি ওঠে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গত বছরের ৭ এপ্রিল একটি চিঠির মাধ্যমে পাসপোর্টে পুনরায় ‘ইসরাইল ব্যতীত’ যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্ত কেবল সীমিত পরিসরে, বিশেষ করে কূটনৈতিক পাসপোর্টের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছিল। এবার সরকার সব ধরনের পাসপোর্টে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে।
বর্তমান নীতিগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নতুন ডিজাইন অনুযায়ী পাসপোর্ট প্রস্তুতের জন্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন সংস্করণের পাসপোর্টে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে এবং পুরোনো পাসপোর্টধারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। মেয়াদ শেষ হলে নবায়নের সময় নতুন সংস্করণ প্রদান করা হবে।
এদিকে শুধু শব্দবন্ধ নয়, পাসপোর্টের ভিজ্যুয়াল ডিজাইনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বর্তমান ই-পাসপোর্টের প্রতিটি পাতায় থাকা জলছাপে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রতীকী ছবি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন ডিজাইনে কিছু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক যুক্ত করা হবে এবং কিছু আগের চিহ্ন বাদ দেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন জাতীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার পুনর্বিন্যাস। একই সঙ্গে নতুন কিছু প্রতীকী ছবি যুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রতিক সামাজিক ঘটনাকে তুলে ধরবে। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট একটি প্রতীকী ছবি যুক্ত করার বিষয়, যা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাসপোর্ট ডিজাইনে এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় নথির ভেতরে প্রতীকী ও রাজনৈতিক বার্তা অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় অবস্থানের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, পাসপোর্টের মতো আন্তর্জাতিক নথিতে পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি কূটনৈতিক ইঙ্গিতও বহন করে। বিশেষ করে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ পুনর্বহালকে অনেকেই বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন, যেখানে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।
এদিকে নাগরিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি দেশের অবস্থানগত স্পষ্টতা প্রকাশ করবে, আবার অনেকে মনে করছেন, পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিতে রাজনৈতিক বার্তা যুক্ত করা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর বলছে, এই পরিবর্তন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখেই নতুন ডিজাইন কার্যকর করা হবে। তাদের মতে, পাসপোর্টে পরিবর্তন আনা হলেও নাগরিকদের ভ্রমণ সুবিধা বা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতায় কোনো সমস্যা হবে না।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থায় আসতে যাওয়া এই পরিবর্তনকে অনেকেই একটি নীতিগত ও প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এটি শুধু একটি শব্দ সংযোজন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পরিচয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন পরিবর্তন কার্যকর হলে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নীতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কিছুটা কৌতূহল তৈরি করতে পারে।