ইবোলা ভ্যাকসিনে দেরি, বাড়ছে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ২২ বার
ইবোলা ভ্যাকসিনে দেরি, বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ইবোলার নতুন স্ট্রেইন নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বর্তমান ‘বুন্ডিবুগিও’ স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন প্রস্তুত হতে আরও ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) এবং প্রতিবেশী উগান্ডায় নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বুধবার জেনেভায় আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএইচওর বিশেষজ্ঞ ড. ভাসি মূর্তি বলেন, নতুন স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে দুটি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছেন। তবে এখনো কোনো ভ্যাকসিনই চূড়ান্ত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে জনসাধারণের জন্য দ্রুত টিকা সরবরাহের বিষয়টি আপাতত অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

ড. ভাসি মূর্তি আরও জানান, বিদ্যমান ইবোলা প্রতিরোধী ভ্যাকসিন সাধারণত ‘জায়ার’ স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর হলেও নতুন বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ক্ষেত্রে তা কার্যকর নাও হতে পারে। এ কারণে নতুন ভ্যাকসিন উন্নয়নের কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, কার্যকর ভ্যাকসিন প্রস্তুত হতে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ভ্যাকসিনের মধ্যে একটি বিদ্যমান প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হচ্ছে, যা পূর্বের ইবোলা টিকার সঙ্গে কিছুটা মিল থাকতে পারে। অপরদিকে আরেকটি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড-১৯ টিকার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে। তবে এই ভ্যাকসিনগুলোর কার্যকারিতা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রাণীদের ওপর পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার ফলও এখনো পাওয়া যায়নি।

ডব্লিউএইচও জানায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কিছু ডোজ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। তবে এটি কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করতে আরও সময় লাগবে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভ্যাকসিন না থাকায় সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।

বর্তমানে ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশে ইবোলার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইতুরি প্রদেশকে প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ড. টেড্রস আধানোম গেব্রেয়াসুস জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে এবং ১৩৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা ও রিপোর্টিং বিলম্বের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোতে ৫১টি এবং উগান্ডায় দুটি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় শনাক্ত হওয়া দুইজনই ডিআর কঙ্গো থেকে আসা ব্যক্তি, যাদের মধ্যে একজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। সীমান্তবর্তী এই সংক্রমণ নতুন করে আঞ্চলিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ডব্লিউএইচও পরিস্থিতিকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করলেও এখনো এটিকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি। সংস্থাটি বলছে, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ঝুঁকি এখনো ‘উচ্চ’ পর্যায়ে রয়েছে, তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে ‘নিম্ন’।

ইবোলা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৬ সালে বর্তমান ডিআর কঙ্গোর অঞ্চলে। ধারণা করা হয়, বাদুড় থেকে এই ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়ায়। নতুন শনাক্ত হওয়া বুন্ডিবুগিও স্ট্রেইন তুলনামূলকভাবে কম প্রাণঘাতী হলেও এটি অত্যন্ত বিরল এবং এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকবার এর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

২০০৭ সালে উগান্ডা এবং ২০১২ সালে ডিআর কঙ্গোতে এই স্ট্রেইনের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। সে সময় আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছিল, যা এই ভাইরাসের সম্ভাব্য ভয়াবহতা আবারও সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘদিনের সংঘাত, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েডের মতো সাধারণ রোগের সঙ্গে ইবোলার প্রাথমিক উপসর্গের মিল থাকায় রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত না হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য, তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও চিকিৎসাসামগ্রী না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ভ্যাকসিন না এলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জরুরি অর্থায়ন এবং গবেষণা ত্বরান্বিত করা এখন সময়ের দাবি।

সব মিলিয়ে, ইবোলার নতুন স্ট্রেইনকে কেন্দ্র করে আফ্রিকার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আবারও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় থাকা এই পরিস্থিতি শুধু আক্রান্ত দেশগুলোর জন্যই নয়, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত