বকেয়া সংকটে চামড়া ব্যবসা বিপর্যয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ১৫ বার
বকেয়া সংকটে চামড়া ব্যবসা বিপর্যয়

প্রকাশ: ২১ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিনের বকেয়া অর্থ অনিশ্চয়তা, লবণ ও শ্রমিক মজুরির ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার—সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালভিত্তিক খাত চামড়া ব্যবসা গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। ঈদুল আজহার কোরবানিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর যে বিপুল চামড়া বাণিজ্য হয়, এবার তা নিয়েই অনিশ্চয়তা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চামড়া কেন্দ্র যশোরের রাজারহাট হাটে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে ট্যানারি মালিক ও বড় মহাজনদের কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া আটকে আছে। সেই অর্থ এখনো পরিশোধ না হওয়ায় নতুন মৌসুমে তারা চামড়া কেনার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন জোগাড় করতে পারছেন না। ফলে আসন্ন কোরবানির মৌসুম ঘিরে বাজারে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাওয়ার কথা ছিল, তা এবার অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।

Jessore District-এর রাজারহাট হাটকে কেন্দ্র করে যশোরসহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং আশপাশের ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও নাটোরের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে চামড়া বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তবে এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে চাহিদা থাকলেও নগদ টাকার সংকট এবং বকেয়া অনিশ্চয়তা পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা অতীতের লোকসান কাটিয়ে উঠতে নতুন করে ঋণ নিয়ে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পুরোনো পাওনা না ফেরায় সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যাচ্ছে। অনেকেই ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে বা ঋণের বোঝা বাড়িয়ে ব্যবসা চালিয়ে গেলেও এখন আর নতুন করে বিনিয়োগ করার সক্ষমতা নেই।

একজন দীর্ঘদিনের চামড়া ব্যবসায়ী জানান, গত কয়েক মৌসুমে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করা চামড়ার অর্থ এখনো পুরোপুরি ফেরত পাননি। ফলে চলতি মৌসুমে বাজারে অংশগ্রহণ করাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াই এখন আর লাভ-ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

শুধু বকেয়া নয়, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লবণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় চামড়া সংরক্ষণের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি ইউনিট চামড়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়ও বেড়ে গেছে। অথচ বাজারে চামড়ার দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

তাদের দাবি, হাটে যে চামড়া নির্দিষ্ট দামে বিক্রি হওয়ার কথা বলা হয়, বাস্তবে তা অনেক সময়ই কার্যকর হয় না। গ্রাম থেকে সংগ্রহের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম দিতে হয়, যা বাজারে বিক্রির সময় মুনাফার পরিবর্তে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয় ব্যবসায়ীদের।

আরও গভীর সংকট তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দেশের চামড়া শিল্প একসময় বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও এখন তা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। রফতানির সুযোগ সীমিত হওয়ায় স্থানীয় বাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে, যা মূল্যহ্রাস ও লোকসান বাড়াচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী মহলের একাংশ মনে করছে, সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই খাত ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। তারা বকেয়া অর্থ দ্রুত পরিশোধ, ব্যাংকিং সহায়তা সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে আবারও চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, শুধু রাজারহাট হাটেই প্রায় শত শত ছোট-বড় ব্যবসায়ী জড়িত। সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ঈদের সময় এই হাটে কোটি কোটি টাকার চামড়া কেনাবেচা হয়, যা দেশের চামড়া শিল্পের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করে।

তবে বকেয়া অর্থ আটকে থাকা এবং বাজারে আস্থার সংকট পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সমিতির নেতারা বলেন, সময়মতো অর্থ পরিশোধ না হলে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন, যার প্রভাব সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পড়বে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংকট কেবল ব্যবসায়িক নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিকও। কারণ চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন খাত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ফলে একটি খাতের স্থবিরতা পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রভাবিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চামড়া শিল্পকে টেকসই করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে বাজার সম্প্রসারণ, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। না হলে প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে একই ধরনের সংকট পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যশোরের ব্যবসায়ীরা এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ নতুন করে ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারছেন না, আবার পুরোনো ঋণের চাপও তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না এলে এই খাত থেকে বহু ব্যবসায়ী চিরতরে হারিয়ে যাবেন।

সব মিলিয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্প এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বকেয়া সংকট, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার সংকোচনের এই ত্রিমুখী চাপ কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই খাতের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত