অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন জোর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন জোর

প্রকাশ: ২১ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও আলোচনার মধ্যেই এবার অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনায় অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে বাংলাদেশ। নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের ভেতরে পানি সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার এবং বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর জোর দিলে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ এবং ভারত-এর মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চললেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের কৃষিজমিতে তীব্র সেচ সংকট দেখা দেয়, যা কৃষকদের জীবন-জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছিল।

সম্প্রতি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে বিষয়টি নতুন গতি পেয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একনেকে অনুমোদন পেয়েছে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার মহাপরিকল্পনাও পুনরায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দেশের কৃষি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ টেকসই করতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক নদীর ওপর নির্ভরশীলতা যথেষ্ট নয়, বরং অভ্যন্তরীণ পানি সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করা, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো এবং নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, সরকার দেশের পানি ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে সাজাতে কাজ করছে। তার মতে, কৃষিতে সেচ ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং পানি সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি চালু করাই এখন অগ্রাধিকার।

তিনি আরও জানান, সারা দেশে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে, যাতে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যায়। এই উদ্যোগকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি কৃষি নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হলেও দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে অনেক নদী ও খাল কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হলেও শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানির সংকট। এই ভারসাম্যহীনতা কৃষি ও পরিবেশ উভয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। এতে একদিকে যেমন কৃষি উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমবে। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, এই কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়ে আরও দক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়েও অগ্রগতি হয়।

পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়, বরং নদী পুনরুদ্ধার, দখলমুক্তকরণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সংকটের কারণে প্রতিবছর কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশেষ করে ধান ও গম উৎপাদনে পানির অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা গেলে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এদিকে নীতিনির্ধারকদের ধারণা, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন যুগের সূচনা হবে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টন আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন একটি দ্বিমুখী কৌশলের পথে হাঁটছে—একদিকে অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, অন্যদিকে অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই পথ একসঙ্গে অনুসরণ করাই দেশের পানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত