মধ্যপ্রাচ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তা চুক্তির আহ্বান তুরস্কের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলের জন্য একটি নিজস্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আস্থাভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বাইরের শক্তির আধিপত্য কিংবা একক কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সহযোগিতাই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

বৃহস্পতিবার সম্প্রচারিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিদান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বাস্তবতা, উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক কাঠামো নিয়ে তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গভীর আস্থার অভাব। এই আস্থার সংকট দূর না হলে কোনো নিরাপত্তা চুক্তিই কার্যকর ও টেকসই হবে না।

হাকান ফিদানের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখনও নিরাপত্তার জন্য বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে ওঠেনি। তিনি মনে করেন, এই নির্ভরশীলতা অঞ্চলটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক নয়। বরং নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়াই সময়ের দাবি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদাহরণ টেনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইতিহাসে বিভক্ত, যুদ্ধবিক্ষত ও পরস্পরবিরোধী রাষ্ট্রগুলোও চাইলে একটি কার্যকর ও স্থায়ী আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুরু হয়েছিল সীমিত আকারে, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর সংঘাতের স্মৃতি নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে আস্থা, নিয়মকানুন এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে সেটি একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে। ফিদানের ভাষায়, “দেখুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত টিকে আছে। তারা যদি পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না?”

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোরও দায়িত্বশীল আচরণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে একই ধরনের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্মান করার সংস্কৃতি।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং এতে তুরস্কের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফিদান বলেন, এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা চুক্তি অবশ্যই আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এমন হওয়া উচিত, যেখানে কোনো দেশ বা গোষ্ঠী নিজেকে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাবে না।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সেখানে কারো একক আধিপত্য থাকবে না—তুর্কি আধিপত্য নয়, আরব আধিপত্য নয়, ফার্সি আধিপত্য নয়, অন্য কোনো আধিপত্যও নয়।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, তুরস্ক নিজেকে আঞ্চলিক নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে নয়, বরং একটি সহযোগী ও ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি নতুন কূটনৈতিক অবস্থানকে জোরালোভাবে সামনে আনছে। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটি ইরান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বিভিন্ন শক্তির প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় জর্জরিত। ফিদানের বক্তব্য সেই প্রতিযোগিতার বিপরীতে একটি সহযোগিতামূলক কাঠামোর ধারণা তুলে ধরে।

সিরিয়া প্রসঙ্গে তুরস্কের অবস্থানও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। হাকান ফিদান বলেন, সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে আছে। এই সংকট নিরসনে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া সহজতর করতে তুরস্ক যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি জানান, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তুরস্ক সিরিয়ায় সহিংসতা কমানো এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করছে।

ফিদানের বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিয়া সংকটের সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। এই যুদ্ধ শুধু সিরিয়ার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব শরণার্থী সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির সংঘাতে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে এবং একটি পুরো প্রজন্ম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা কেবল সামরিক বিষয় নয়; এটি মানুষের নিরাপদ জীবন, উন্নয়ন ও মর্যাদার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তুরস্কের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। একদিকে এটি পশ্চিমা নিরাপত্তা ছাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সমালোচনা, অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার আহ্বান। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং স্বার্থের সংঘাত কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আদৌ এমন একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে কি না।

তবুও ফিদানের বক্তব্যে আশাবাদের সুর স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, যদি আঞ্চলিক দেশগুলো আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে এবং একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন নিরাপত্তা অধ্যায় শুরু হতে পারে। সেই অধ্যায় হবে আধিপত্যের নয়, বরং সহযোগিতা ও আস্থার।

সব মিলিয়ে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের দ্বার খুলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি সম্ভাব্য পথের ইঙ্গিতও বটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত