উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পুতিন–লারিজানি বৈঠক, নজর বিশ্বরাজনীতির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার
উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পুতিন–লারিজানি বৈঠক, নজর বিশ্বরাজনীতির

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক সেই সময় রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার সাক্ষাৎ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার মস্কোর ক্রেমলিনে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানির সঙ্গে পুতিনের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি এমন এক সময় হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তির প্রসঙ্গ তুলেছেন এবং একই সঙ্গে সামরিক হামলার হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ক্রেমলিন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানায়, রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান ক্রেমলিনে আলী লারিজানিকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সরকারি সফরে মস্কো এসেছেন এবং উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে বৈঠকের বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, যা কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই বৈঠকের সময়টিই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি কেড়েছে সবচেয়ে বেশি। শুক্রবারের শুরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে ইরান সামরিক সংঘাত এড়াতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। ট্রাম্পের এই দ্বৈত অবস্থান—একদিকে আলোচনার আহ্বান, অন্যদিকে হামলার হুমকি—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর পদক্ষেপে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যদিও ইরান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে, তবুও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা আলোচনা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের মস্কো দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নিশ্চিত করেছে যে শুক্রবার পুতিন ও লারিজানির মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সেখানে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে দূতাবাসও আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক এবং পারমাণবিক ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আরআইএ নভোস্তি জানিয়েছে, আলী লারিজানির এই সফরের কথা আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। হঠাৎ এই সফর এবং পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই সাক্ষাৎ হলো, যখন রাশিয়া নিজেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চাপের মুখে রয়েছে এবং ইরান রাশিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, ইরান রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দিয়েছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও তেহরান সরাসরি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবুও দুই দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা যে বেড়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই প্রেক্ষাপটে পুতিন–লারিজানি বৈঠককে কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

রাশিয়া ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মস্কোর দাবি, তারা পারমাণবিক ইস্যুতে উত্তেজনা কমাতে এবং আলোচনার পথ সুগম করতে ভূমিকা রাখতে চায়। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাশিয়ার এই মধ্যস্থতার প্রস্তাবের পেছনে কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে ইরানকে পাশে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে মস্কো।

অন্যদিকে ইরানের জন্যও রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে রাশিয়া নিয়মিতভাবে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে অথবা অন্তত কঠোর পশ্চিমা প্রস্তাবগুলোর বিরোধিতা করেছে। ফলে তেহরানের জন্য মস্কোর সমর্থন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুতিনের সঙ্গে লারিজানির বৈঠক সেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের মাধ্যমে রাশিয়া ও ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে—তারা একে অপরের কৌশলগত অংশীদার এবং পশ্চিমা চাপের মুখেও একে অপরকে ছাড়বে না। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও পারমাণবিক আলোচনায় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা আবার ভেঙে পড়ে, তাহলে রাশিয়ার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, মস্কোতে পুতিন ও আলী লারিজানির এই বৈঠক শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ, পারমাণবিক চুক্তি এবং বিশ্বশক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতার মধ্যে এই সাক্ষাৎ ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এটুকু স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক উত্তেজনার এই সময়ে রাশিয়া ও ইরান তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও সামনে এনে বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত