প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত আলোচিত ও ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ—আশুলিয়ায় ছয় তরুণকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায়ের ঘোষণা দেবেন বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু শহীদদের পরিবার নয়, বরং পুরো দেশ।
বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। জুলাই বিপ্লবের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এটি তৃতীয় মামলার রায় হলেও ট্রাইব্যুনাল-২–এর প্রথম রায় হতে যাচ্ছে। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও চাঁনখারপুল মামলার রায় ঘোষণা করেছিল, যা দেশে বিচারপ্রক্রিয়ার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
এই মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শহীদ পরিবারের সদস্য, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে আদালত প্রাঙ্গণ আজ আবেগঘন পরিবেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেকেই এটিকে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
গত রোববার ট্রাইব্যুনাল এই দিন রায় ঘোষণার জন্য ধার্য করেন। তার আগে ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে ২৪ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন এ এস আই শেখ আবজালুল হক, যিনি রাজসাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে শহীদদের পরিবার এবং পুরো জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে জবানবন্দি দেন। তার বক্তব্য মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে মনে করেন আইন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এই মামলাকে জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বর্বর অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আদালতে বলেন, ঢাকা শহরের অদূরে আশুলিয়ায় যা ঘটেছে, তা মানবতার ইতিহাসে বিরল। ছয়জন তরুণকে শুধু গুলি করে হত্যা করা হয়নি, বরং একজনকে জীবন্ত অবস্থায় এবং অপর পাঁচজনের লাশ একটি গাড়িতে তুলে খড়ি-কাঠ দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার ভাষায়, “এ ধরনের নিষ্ঠুরতার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম। পুলিশ বাহিনীর সদস্য হয়ে যারা জাতির সূর্যসন্তানদের এভাবে হত্যা করেছে, তাদের অপরাধ কাঁচের মতো স্বচ্ছভাবে প্রমাণিত হয়েছে।”
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত লাইভ উইটনেসের বয়ান আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রমাণে অভিযুক্তদের পরিচয় ও ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ মনে করছে। তাই তারা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছে।
এই মামলায় মোট ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক আবদুল মালেক, আরাফাত উদ্দীন, কামরুল হাসান, রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হক এবং সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার। সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ অপর আট আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২ জুলাই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রের সঙ্গে ৩১৩ পৃষ্ঠার নথি, ৬২ জন সাক্ষীর তালিকা, ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়। ট্রাইব্যুনাল এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গত বছরের ২১ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয় এবং ১৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ সূচনা বক্তব্য দেয়। এরপর একে একে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
মামলার নৃশংস ঘটনার বিবরণ শুনে আদালত প্রাঙ্গণেও নীরবতা নেমে আসে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল তিনটার দিকে আশুলিয়া থানার সামনে পাঁচ তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলিতে গুরুতর আহত হন আরও একজন। পরে আহত ব্যক্তিসহ নিহতদের মরদেহ প্রথমে একটি প্যাডেল ভ্যানে তোলা হয়, সেখান থেকে পুলিশের একটি গাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। একপর্যায়ে সেই গাড়িতেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় শহীদ হন সাজ্জাদ হোসেন (সজল), আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি, আবুল হোসেন ও একজন অজ্ঞাত তরুণ।
শহীদদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই মামলার রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের অনেকেই বলছেন, প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, তবে দোষীদের শাস্তি হলে অন্তত আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা হবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই রায়কে আইনের শাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দেবে। আইন ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে এই রায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এখন সবার দৃষ্টি ট্রাইব্যুনালের এজলাসে—কী রায় আসে, এবং তা জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে ন্যায়বিচারের কোন অধ্যায় যুক্ত করে।