লোকসংগীতের আকাশে নিভে গেল এক উজ্জ্বল বাউল নক্ষত্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
লোকসংগীতের আকাশে নিভে গেল এক উজ্জ্বল বাউল নক্ষত্র

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলার লোকসংগীত ও বাউল ধারার এক খাঁটি প্রতিনিধি, প্রখ্যাত বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত হয়েছে গোটা লোকসংগীত অঙ্গন, বিশেষ করে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও বাউলপ্রেমী মানুষদের হৃদয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহশিল্পী ও শিষ্য রেখে গেছেন।

সুনীল কর্মকারের প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বন্যা বইতে থাকে। বাউলশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ শ্রোতারা তাকে স্মরণ করছেন গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। অনেকেই লিখেছেন, তার কণ্ঠে ছিল বাংলার মাটির গন্ধ, মানুষের কথা আর আত্মিক অনুসন্ধানের এক অনন্য মেলবন্ধন।

১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বান্দনাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুনীল কর্মকার। গ্রামবাংলার সহজ-সরল পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার ছিল অদম্য আকর্ষণ। মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি গানের জগতে পা রাখেন। তখন থেকেই স্থানীয় আসর, গ্রামীণ অনুষ্ঠান ও বাউল গানের আড্ডায় তার কণ্ঠ শোনা যেতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠে যোগ হয় গভীরতা, অভিজ্ঞতা আর আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া।

সুনীল কর্মকারের কণ্ঠ ছিল ভরাট, আবেগময় ও দরদি। একাই একটি আসর মাতিয়ে তোলার ক্ষমতা ছিল তার। শ্রোতারা বলতেন, তার গান শুনলে মনে হতো তিনি শুধু গান করছেন না, জীবনের কথা বলছেন। মানুষের দুঃখ, আনন্দ, প্রেম আর স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের বাণী তার গানে বারবার ফিরে আসত। তিনি শুধু একজন কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ লোকশিল্পী। বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়াম— একাধিক বাদ্যযন্ত্রে তার পারদর্শিতা ছিল ঈর্ষণীয়। মঞ্চে তার উপস্থিতি মানেই ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক আবেশ।

বিখ্যাত বাউলশিল্পী ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর গান শুনেই মূলত বাউল ধারায় নিজেকে সঁপে দেন সুনীল কর্মকার। জালাল উদ্দিন খাঁ ছিলেন তার আদর্শ, অনুপ্রেরণা ও গুরুতুল্য ব্যক্তিত্ব। এই গুরুর অসংখ্য গানে তিনি সুর করে কণ্ঠ দিয়েছেন, যা পরবর্তীতে লোকসংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘মানুষ ধরো, মানুষ ভোজ’— এই কালজয়ী গানে তার কণ্ঠ শ্রোতাদের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। এই গানেই মূলত তিনি দেশজুড়ে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

শুধু গানে কণ্ঠ দেওয়া নয়, নিজেও একজন শক্তিশালী গীতিকার ছিলেন সুনীল কর্মকার। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, মানুষের অন্তর্লোকের কথা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও সমাজবাস্তবতা মিলিয়ে তিনি প্রায় দুই শর কাছাকাছি গান রচনা করেছেন। তার লেখা গানগুলোতেও ছিল মানবপ্রেম, আত্মঅনুসন্ধান ও স্রষ্টার প্রতি গভীর ভক্তির প্রকাশ। সহজ ভাষায় গভীর দর্শন প্রকাশই ছিল তার গানের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম সুনীল কর্মকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, তিনি দীর্ঘকাল ধরে বাউল ও লোকসংগীতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক চেতনার বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। তার গান শুধু বিনোদনের জন্য নয়, মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তোলার কাজ করেছে। এমন শিল্পীর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

সুনীল কর্মকার ছিলেন গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তার গানে আধুনিকতার চাকচিক্য ছিল না, ছিল মাটির গন্ধ, ছিল শেকড়ের টান। একতারা আর দোতারার ছন্দে তার কণ্ঠের যে বিশেষ আবেদন, তা শ্রোতাদের মুগ্ধ না করে পারত না। তার গাওয়া গান শুনে অনেকেই বলতেন, যেন কোনো সাধক মনের কথা বলে যাচ্ছেন। সংগীতই ছিল তার একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান। খ্যাতি বা প্রচারের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন গানের গভীরতা ও বার্তাকে।

কেন্দুয়া জালাল পরিষদের সদস্য আয়েশ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, বাউল সুনীল কর্মকার ছিলেন জালাল ভাবশিষ্য এবং এক কালজয়ী বাউল শিল্পী। তার মতো খাঁটি শিল্পী এখন খুব কমই দেখা যায়। তার মৃত্যুতে কেন্দুয়া তথা গোটা নেত্রকোনা জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি যে শূন্যতা রেখে গেলেন, তা পূরণ হওয়ার নয়।

তার মৃত্যুর খবরে কেন্দুয়া, মদন, আটপাড়া, ময়মনসিংহসহ আশপাশের এলাকায় শোকাহত মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করেন। সহশিল্পী, স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও গুণগ্রাহীরা তার জীবনের নানা স্মৃতি স্মরণ করেন। অনেকেই বলছেন, তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী, সহজ-সরল ও মানুষের খুব কাছের একজন শিল্পী। খ্যাতি সত্ত্বেও গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অটুট।

লোকসংগীত গবেষকদের মতে, সুনীল কর্মকারের মতো শিল্পীরা বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আধুনিক সংগীতের দাপটে যখন লোকগান হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে, তখন তার মতো শিল্পীরাই গ্রামগঞ্জে ঘুরে ঘুরে লোকসংগীতকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তার কণ্ঠে ধারণ করা গানগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে মূল্যবান সম্পদ।

সুনীল কর্মকারের প্রয়াণে বাংলা লোকসংগীত এক বিশ্বস্ত সাধককে হারাল। তার কণ্ঠ হয়তো থেমে গেছে, কিন্তু তার গান, তার ভাবনা ও তার সাধনা বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। একজন খাঁটি বাউল হিসেবে তিনি যে জীবনদর্শন ও মানবিকতার বাণী রেখে গেছেন, তা বহুদিন ধরে লোকসংগীতপ্রেমীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। তার আত্মার শান্তি কামনা করছে দেশজুড়ে অসংখ্য শ্রোতা ও গুণগ্রাহী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত