প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান টানাপোড়েন, ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিন্যাস নিয়ে আলোচনার মধ্যেই নতুন করে বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, জনগণ চাইলে শেখ হাসিনার সন্তানেরাও রাজনীতিতে ফিরতে পারেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শেষ সিদ্ধান্ত জনগণের হাতে— এমন বার্তাই দিয়েছেন তিনি। তার এই মন্তব্য ইতোমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, শেখ হাসিনার সন্তানেরা বিদেশ থেকে ফিরে এসে রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারবেন কি না। জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, রাজনীতি করার অধিকার সবার রয়েছে। যদি জনগণ কাউকে গ্রহণ করে, যদি মানুষ স্বাগত জানায়, তাহলে যে কারো রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানেই মানুষের মতামত ও রায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
তারেক রহমানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার পরিবারকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তার সন্তানরাও বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের মন্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক সৌজন্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান আরও স্পষ্ট করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করবে না। তার ভাষায়, একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা জরুরি। জনগণের সমর্থন ছাড়া কেউ রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারে না, আবার জনগণ চাইলে যে কেউ রাজনীতিতে আসতে পারে। এই অবস্থানকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি ভিন্ন বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের পর সম্ভাব্য সরকার গঠন নিয়েও কথা বলেন তারেক রহমান। নির্বাচনের পর তার প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠনের প্রস্তাব তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরকার গঠন করা বাস্তবসম্মত নয়। তার যুক্তি, যদি প্রধান বিরোধী শক্তিকেই সরকারে নেওয়া হয়, তাহলে সংসদে বিরোধী দল থাকবে কোথায়। গণতন্ত্রের স্বার্থেই শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। সেখানে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা স্পষ্ট থাকতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও তার বক্তব্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে যে, সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপি একক বা জোট শরিকদের নিয়েই এগোতে চায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে নয়।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তারেক রহমানের সহযোগীরা দাবি করেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের বিষয়ে বিএনপি আশাবাদী। জানা গেছে, বিএনপি সরাসরি ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বাকি আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের জোট শরিকরা। যদিও ঠিক কতটি আসনে বিএনপি জয় পেতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বলতে রাজি হননি তারেক রহমান।
তবে তিনি বলেন, বিএনপি আত্মবিশ্বাসী যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন তারা অর্জন করবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করতে পারবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য বিএনপির মাঠের বাস্তবতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন।
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তাকে প্রশ্ন করা হয়, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত থেকে সরে গিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকবে কি না। জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সক্ষমতা রয়েছে— এমন অংশীদারদের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী বিএনপি।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাই হবে অন্যতম অগ্রাধিকার। দেশে ও বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনতে হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করতে হবে, যাতে নতুন নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার ভাষায়, মানুষ যেন সম্মানের সঙ্গে ভালো জীবনযাপন করতে পারে, সেটাই রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যে দেশ বা অংশীদার জনগণ ও দেশের জন্য বাস্তবসম্মত ও উপকারী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হবে। নির্দিষ্ট কোনো দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকেই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথা বলেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে তারেক রহমানের মন্তব্য ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। এটি একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি বিএনপির পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে সরকার গঠন, বিরোধী দল এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে স্পষ্ট করেছে।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। শেখ হাসিনার পরিবার, বিএনপির সরকার গঠনের পরিকল্পনা, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি— সবকিছু মিলিয়ে এই বক্তব্য আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।