বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্র সফরে শি জিনপিং: সম্পর্ক উষ্ণতার ইঙ্গিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী বছর শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হোয়াইট হাউস সফর করবেন, যা দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক। দীর্ঘদিনের বাণিজ্য যুদ্ধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে মতপার্থক্যের পর এবার দুই পরাশক্তির সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে পারে—এমন ইঙ্গিতই মিলছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন এবং তাকে হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হবে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এই ঘোষণাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, বছরের শেষ ভাগে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি চলছে। বুধবার রেকর্ড করা ওই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দুই নেতার মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য সম্পর্ক, তাইওয়ান পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়া ও ইরান—সবকিছুই উঠে এসেছে আলোচনায়। ট্রাম্পের ভাষায়, এই আলোচনা ছিল “ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ”, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

শুধু তাই নয়, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি নিজেও আগামী এপ্রিল মাসে চীন সফরে যেতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য সফরটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বড় পদক্ষেপ। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পরই পাল্টা সফর হিসেবে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে আসতে পারেন। কূটনৈতিক ভাষায় এটিকে বলা হচ্ছে ‘ডাবল এনগেজমেন্ট’, যা দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।

ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি। তার মতে, এই দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা শুধু দ্বিপাক্ষিক স্বার্থেই নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সরাসরি যোগাযোগ অনেক জটিল বিষয় সহজ করতে সহায়তা করছে।

তবে এই সম্পর্কের পটভূমিতে রয়েছে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা। হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন আবারও কঠোর শুল্ক নীতিতে ফিরে যায়। ইস্পাত, গাড়ি, প্রযুক্তিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। এর জবাবে বেইজিংও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করে। যদিও গত বসন্তে বড় ধরনের উত্তেজনার পর উভয় দেশ একটি সামগ্রিক সমঝোতায় পৌঁছায়, তবুও পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরোপুরি কাটেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনা উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবে দুই দেশের অর্থনীতি এখনও গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রযুক্তি, ভোক্তা পণ্য, শিল্প উপকরণ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই নির্ভরতা স্পষ্ট। ফলে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ নেই, বরং সমন্বয়ের পথেই এগোতে হচ্ছে উভয় পক্ষকে।

এই কূটনৈতিক আবহে তাইওয়ান ইস্যু আবারও সামনে এসেছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন সিসিটিভির খবরে বলা হয়েছে, বুধবার শি জিনপিং ট্রাম্পকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তাকে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। এই ইস্যুটি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল দিক হিসেবে বিবেচিত।

শি জিনপিং তার বক্তব্যে আশাবাদ প্রকাশ করেন যে বাণিজ্যসহ অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব। তিনি পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেন এবং বলেন, সংঘাত নয়, সহযোগিতাই দুই দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক।

অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতেও দুই দেশের অবস্থান এখনো ভিন্ন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেয়। তবে বেইজিং আপাতত এ ধরনের আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের কৌশলগত অবস্থানেরই প্রতিফলন, যেখানে তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলাদা হিসাব কষছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা—এই সব সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সমন্বয় বা দ্বন্দ্ব বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ওঠানামা বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে সচেষ্ট।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ঘোষণায় শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। যদিও এখনো অনেক বিষয় অনিশ্চিত, তবুও কূটনৈতিক ভাষায় এটিকে বলা যায় সম্পর্ক উষ্ণতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। বছরের শেষ দিকে এই সফর বাস্তবে রূপ নিলে তা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত