নেতৃত্ব: ক্ষমতার নয়, দায়িত্বের পরীক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
নেতৃত্ব লালসার নয়, দায়িত্বের কঠিন আমানত

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের সমাজজীবনে নেতৃত্ব একটি অপরিহার্য এবং নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এমন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি দিকনির্দেশনা দেবেন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং মানুষের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করবেন। কিন্তু ইসলাম নেতৃত্বকে কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতা বা মর্যাদা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেনি। বরং ইসলামী দর্শনে নেতৃত্বকে একটি গুরুতর দায়িত্ব এবং কঠিন আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি যে শুধুমাত্র মর্যাদা বা প্রাধান্য পাওয়ার মাধ্যমে অর্জনযোগ্য, তা নয়; বরং এটি সেবা, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনগণের কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে অর্জিত হওয়া উচিত।

হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, যারা নেতৃত্বের জন্য তৃষ্ণা বা লালসা নিয়ে আসে, তাদেরকে সেই পদে নিয়োগ করা হয় না। আবূ মূসা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি এবং তার দুই সহযোগী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসেন। তারা চাইতেন কোনো বিষয়ে আমীর হিসেবে নিযুক্ত হতে। তখন নবী করুণাময় সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সতর্ক করেন, যাদের নেতৃত্ব কামনা করার প্রবণতা আছে, তাদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৯)

এই হাদিস ইসলামিক নেতৃত্ব-দর্শনের মৌলিক নীতি প্রকাশ করে। এখানে নেতৃত্বকে কোনো সম্মানসূচক পদ বা ব্যক্তিগত অর্জনের চিহ্ন হিসেবে নয়, বরং জনগণের অধিকার ও কল্যাণ রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জবাবদিহিমূলক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি নিজে থেকে নেতৃত্ব কামনা করে, তার মধ্যে প্রায়ই ক্ষমতার আকর্ষণ, প্রভাব বিস্তারের ইচ্ছা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করতে পারে। আর এ ধরনের মানসিকতা নেতৃত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি নেতৃত্বকে একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন, সুযোগ নয়। তিনি পদকে সম্মানের উৎস হিসেবে দেখেন না; বরং এটি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যারের (রা.)কে বলেছিলেন, নেতৃত্ব একটি আমানত। কিয়ামতের দিন এটি লাঞ্ছনা ও অনুতাপের কারণ হবে, যদি কেউ এর হক আদায় করতে না পারে। (সহিহ মুসলিম)

নেতৃত্বের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা প্রায়শই মানুষকে নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করে। যোগ্যতার পরিবর্তে কৌশল, সেবা-মানসিকতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা এবং জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পায়। ফলস্বরূপ, সমাজে বিভাজন, অন্যায় ও অবিচার বৃদ্ধি পায়। ইসলামের নীতি এই প্রবণতার পথ বন্ধ করতে নেতৃত্বপ্রার্থীতাকে নিরুৎসাহিত করেছে। এর পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা এবং আমানতদারিতাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোরআনেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শক্তি, দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। নবী ইউসুফ (আ.) যখন দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব পেয়েছিলেন, তখন তিনি নিজেকে রক্ষণশীল এবং জ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে প্রমাণ করার কথা বলেছিলেন। (সূরা ইউসুফ: ৫৫) ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, নেতৃত্ব ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিত।

বাস্তবতায় দেখা যায়, যে ব্যক্তি নেতৃত্বের জন্য মরিয়া থাকে, সে প্রায়ই ক্ষমতার মর্যাদা এবং প্রভাব বিস্তারের আকর্ষণে জড়িয়ে পড়ে। আর যে ব্যক্তি নেতৃত্বকে দায়িত্ববোধ থেকে গ্রহণ করে, সে এটিকে সেবা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও জনগণের কল্যাণের মাধ্যমে পালন করে। ইসলামের শিক্ষায় নির্দেশ রয়েছে, নেতৃত্ব চাওয়ার চেয়ে নিজেকে যোগ্য করে তোলা, আমানতদার হওয়া এবং ন্যায়পরায়ণভাবে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ।

যে সমাজে নেতৃত্বকে ক্ষমতার আসন নয়, বরং দায়িত্বের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়, সেই সমাজে ন্যায়, স্থিতি এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শুধু নৈতিক দৃষ্টিকোণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সমাজের স্থায়িত্ব, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য। নেতৃত্বকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার মাধ্যমে জনগণ ও রাষ্ট্র উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

সারকথা, নেতৃত্ব লালসা বা ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ নয়। এটি মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কঠিন আমানত। ইসলামী শিক্ষায় নেতৃত্বের নৈতিক দিক, দায়িত্বপরায়ণতা এবং সততা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। যে সমাজে এ শিক্ষাকে প্রতিপালন করা হয়, সেই সমাজেই স্থিতিশীলতা, ন্যায় ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা আমাদের জন্য চিরন্তন নির্দেশনা, যা আজকের সমাজেও প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত