সমালোচনা করুন, সমস্যা নেই: আসিফ নজরুল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৫ বার
সমালোচনা করেন, সমস্যা নাই: আসিফ নজরুল

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজের কাজের সমালোচনা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেছেন, সমালোচনা করতে কারও ভালো লাগলে তা করতে পারেন, এতে তার কোনো সমস্যা নেই। তবে তিনি অনুরোধ করেছেন, সমালোচনার আগে যেন কাজগুলো সম্পর্কে জানা হয়। তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সরকারি কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

পোস্টে তিনি আত্মসমালোচনার সুরে লিখেছেন, গত দেড় বছরে তাকে নিয়ে নানা মন্তব্য শুনেছেন—কেউ বলেছেন তিনি কিছুই করেননি, কেউ বলেছেন তিনি অপদার্থ উপদেষ্টা। এসব বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাস্তবে কাজগুলো করেছেন তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, তিনি শুধু সেই কাজের অংশীদার ছিলেন। নিজের কর্মদিবসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, ভোরে অফিসে এসে প্রায়ই রাত আটটা বা নয়টা পর্যন্ত কাজ করেছেন এবং সামান্য বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতেও বাসায় বসে দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে গেছেন। শুক্রবার ও শনিবারের মতো সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও সচিবালয়ে উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, পুরো টিমের কাজের মধ্যে কোনো ফাঁকি ছিল না।

তার পোস্টে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সম্পন্ন সংস্কার কার্যক্রমের বিবরণ। তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ২২টি আইনি সংস্কার, ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ এবং হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বিচারব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা।

আইনি সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কিত আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। এতে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথাও তিনি তুলে ধরেন, যা অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিচার বিভাগের নিজস্ব কর্তৃত্বে এসেছে। এই প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তিনি জানান, বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত চালুর ফলে দালিলিক সাক্ষ্যভিত্তিক বিচার, ভার্চুয়াল শুনানি এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের মাধ্যমে এর তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন–এর ক্ষমতা বৃদ্ধি মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে এবং ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নের বিধান যুক্ত হয়েছে। এছাড়া দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধনের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণে এফিডেভিট ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং অনলাইনে সমন জারি করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর করার লক্ষ্যেই করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফৌজদারি আইনে আনা পরিবর্তনগুলোর মধ্যে গ্রেফতার ও রিমান্ড প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা, অভিযুক্তের অধিকার নিশ্চিত করা এবং মিথ্যা মামলার হয়রানি কমানোর বিধান উল্লেখযোগ্য বলে তিনি বলেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে তদন্ত ও বিচার শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ এবং সাক্ষীর সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। নির্বাচনী আইন সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রবাসীদের জন্য ডাক ব্যালট চালু করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ আদালতে ই-কজলিস্ট চালু হয়েছে এবং অনলাইনে সাক্ষ্যগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালুর ফলে মামলা দায়ের থেকে শুনানি পর্যন্ত অনেক কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। তিনি জানান, অনলাইন বেইলবন্ড চালুর ফলে জামিন প্রক্রিয়ার ধাপ কমে এক ধাপে নেমে এসেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ডি-নথি চালুর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের প্রসঙ্গে তিনি জানান, জেলা পর্যায়ে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রায় ২৩ হাজার ৮৬৬টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সাইবার আইনের অধীনে করা শত শত মামলা বাতিল করা হয়েছে। তার মতে, এসব পদক্ষেপে লাখো মানুষ হয়রানি থেকে মুক্তি পেয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত অপরাধের বিচার কার্যক্রম তদারকির জন্য বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।

দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, গত দেড় বছরে মন্ত্রীপর্যায়ে নিষ্পত্তিকৃত নথির সংখ্যা আগের সরকারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং বিভিন্ন দপ্তরে আইনি মতামত প্রদানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানসংক্রান্ত সংস্কার কমিশনগুলোকেও মন্ত্রণালয় সচিবিক সহায়তা দিয়েছে।

তার পোস্টের শেষ অংশে তিনি আবারও সমালোচনার প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলেন, সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, তাই কেউ সমালোচনা করলে তিনি তা গ্রহণ করেন। তবে তার বক্তব্য, সমালোচনার আগে কাজের বাস্তবতা জানা জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি নাগরিকদের উদ্দেশে এমন বার্তা দেওয়া বর্তমান সময়ের প্রশাসনিক যোগাযোগ কৌশলের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। এতে যেমন জনগণ সরাসরি সরকারের বক্তব্য জানতে পারে, তেমনি সমালোচনা ও প্রশ্নও দ্রুত সামনে আসে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ঘোষিত সংস্কারগুলোর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়েছে, তা মূল্যায়ন করতে আরও সময় ও স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে আসিফ নজরুলের পোস্টটি কেবল ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়; বরং সরকারের আইন সংস্কার, বিচারব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখন নজর থাকবে, তার উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং জনগণের অভিজ্ঞতায় তার প্রতিফলন কতটা দেখা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত