প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী শাসনের অবসান এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনাকে ঘিরে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। কূটনৈতিক মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরের টানাপোড়েনের পর বর্তমান পরিবর্তনকে দিল্লি নীতিনির্ধারকেরা স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখছেন, যদিও তারা একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বাস্তব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও সতর্ক।
বাংলাদেশে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা আসতে শুরু করে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিনন্দন বার্তা জানান এবং প্রতিনিধি হিসেবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, এসব পদক্ষেপ শুধু সৌজন্য নয়; বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউনূস সরকারের সময় ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক নানা সময়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে ভারতের পদক্ষেপের প্রকাশ্য সমালোচনা—এসব কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পরিবর্তন দিল্লির জন্য কৌশলগত স্বস্তি এনে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ ছিল ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দিল্লি কার্যত পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ধারার প্রতি তাদের আস্থার ইঙ্গিত দিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-এর অনুপস্থিতি আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাও ভারতীয় বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে।
অন্যদিকে বাস্তবতা বিবেচনায় দিল্লি এখন নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ছাড়া কার্যকর বিকল্প শক্তি নেই। ফলে সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারত বাস্তবভিত্তিক অবস্থান নিয়েছে। তবে সেই সমর্থন নিঃশর্ত নয়। সীমান্ত পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে নতুন সরকারের অবস্থান দিল্লি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এম শহীদুজ্জামান মনে করেন, ভারতের বর্তমান নমনীয়তা কৌশলগত। তার মতে, আপাতত ইতিবাচক বার্তা দিলেও ভবিষ্যতে তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন বা পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে সেটিকে ভারত নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে পারে, যা আবার নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর বলেন, আগামী দিনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক মূলত ইস্যুভিত্তিক হবে। তার মতে, পূর্ববর্তী সময়ে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা ও সহযোগিতা চুক্তিগুলো ভারত বহাল রাখতে চাইবে। পাশাপাশি গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। এসব প্রশ্নে সমাধান পেতে হলে দুই পক্ষকেই ধৈর্য ও কূটনৈতিক দক্ষতা দেখাতে হবে।
দিল্লির প্রশাসনিক নীতিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাউথ ব্লক বর্তমানে বিশেষভাবে নজর রাখছে নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর। তারা পর্যবেক্ষণ করছে নেতৃত্ব অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর সময়কার ভারতনীতি অনুসরণ করে কি না। কারণ ইতিহাসে সেই সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বেশ কয়েকবার টানাপোড়েন দেখা গিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নতুন সরকার একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতকেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। দেশের একটি বড় অংশ চায় পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় থাকুক এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হোক। ফলে সরকারকে একই সঙ্গে কূটনৈতিক নমনীয়তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দৃঢ়তা দেখাতে হবে।
পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ইউনূস সরকারের সময়কার উত্তেজনা উভয় দেশকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে পারস্পরিক নির্ভরতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই সম্পর্কের ওঠানামা থাকলেও সম্পূর্ণ দূরত্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই পর্ব দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। দিল্লি আপাতত স্বস্তিতে থাকলেও ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুই দেশের নেতৃত্ব কতটা বাস্তববাদী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক কখনো সরল নয়; বরং সময়, স্বার্থ ও কৌশলের জটিল সমন্বয়ে গঠিত। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়ও একই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগোবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।