টাইটানিক নয়, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নৌ ট্রাজেডি ‘উইলহেম গুস্টলফ’: ৯ হাজার প্রাণহানির নির্মম অধ্যায়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৫ বার
টাইটানিক নয়, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নৌ ট্রাজেডি 'উইলহেম গুস্টলফ': ৯ হাজার প্রাণহানির নির্মম অধ্যায়

প্রকাশ: ১৬ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বিশ্ব ইতিহাসে টাইটানিক ডুবে যাওয়ার ঘটনা যেমন করুণ, তেমনি তা বহুবার পুনরুচ্চারিত, বিশ্লেষিত ও চিত্রিত। বিলাসবহুল টাইটানিকের সেই দুর্ঘটনায় ১,৫০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি নিয়ে লেখা হয়েছে উপন্যাস, নির্মিত হয়েছে হলিউডের কালজয়ী চলচ্চিত্র। কিন্তু এক ভয়াবহ নৌ দুর্ঘটনার কথা আজও অনেকেই জানেন না—একটি ঘটনা যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৯ হাজার মানুষ, যা টাইটানিকের ট্রাজেডির চেয়েও ছয় গুণ ভয়াবহ। এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল এমভি উইলহেম গুস্টলফ নামক একটি জার্মান জাহাজে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাল্টিক সাগরে ডুবে গিয়েছিল।

১৯৪৫ সালের ৩০ জানুয়ারি, ভয়াবহ শীতের রাত। পোল্যান্ডের গডিনিয়া (তৎকালীন জার্মান নিয়ন্ত্রিত গোটেনহাফেন) বন্দর থেকে জার্মানির কিয়েল বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল এমভি উইলহেম গুস্টলফ। জাহাজে ছিল ১০ হাজারেরও বেশি আরোহী—তাদের মধ্যে ছিলেন জার্মান শরণার্থী, নারী ও শিশু, আহত সৈনিক এবং চিকিৎসাকর্মী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াল প্রেক্ষাপটে, রেড আর্মির অগ্রযাত্রা থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচানোই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

কিন্তু সেই যাত্রা ছিল অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে ভরা। যাত্রার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাল্টিক সাগরের তীব্র ঠান্ডা পানিতে রাশিয়ান সাবমেরিন এস-১৩ তিনটি টর্পেডো নিক্ষেপ করে উইলহেম গুস্টলফকে লক্ষ্য করে। সাবমেরিনটির কমান্ডে ছিলেন ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার মারিনেস্কো। একে একে তিনটি টর্পেডো আঘাত করে বিশাল জাহাজটির গায়ে, এবং মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সেটি সাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়।

ঘন বরফ ও তুষারাচ্ছন্ন সাগরে পানির তাপমাত্রা ছিল প্রাণঘাতী। হাইপোথার্মিয়া, দমবন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পানিতে ডুবে গিয়ে প্রাণ হারান প্রায় ৯ হাজার মানুষ। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৫ হাজারই ছিল শিশু। কিছু সংখ্যক যাত্রীকেই কেবল বেঁচে ফেলা সম্ভব হয়েছিল, তাও অন্য কিছু জাহাজ ও মাছ ধরার নৌকার সহায়তায়।

এমভি উইলহেম গুস্টলফ তৈরি হয়েছিল ১৯৩৭ সালে, হামবুর্গে। এটি মূলত নাজি জার্মানির প্রোপাগান্ডা কার্যক্রম ‘ক্রাফট ডার্স ফ্রয়েডে’র (Strength Through Joy) অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে সাধারণ শ্রমিকদের বিনোদন ও ছুটির ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হতো। পরে যুদ্ধ শুরু হলে এটিকে প্রথমে একটি হাসপাতাল জাহাজ এবং পরে সাবমেরিন কর্মীদের থাকার ব্যারাকে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের শেষদিকে সেটিকে ব্যবহার করা হয় বিপুল সংখ্যক শরণার্থী সরিয়ে নেওয়ার জন্য, যার পরিণতি ঘটে এই মর্মান্তিক ট্রাজেডিতে।

এই জাহাজডুবির ঘটনাটি প্রায়ই ইতিহাসের প্রান্তে চাপা পড়ে থাকে। যুদ্ধের আবহ, নাৎসি সংশ্লিষ্টতা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা এই ঘটনা আন্তর্জাতিক আলোচনার বাইরে ঠেলে দেয়। কেউ কেউ মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া ও ঐতিহাসিক রেকর্ড এই ঘটনার মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতাকে উপেক্ষা করেছে, হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই।

বলাই বাহুল্য, উইলহেম গুস্টলফ ট্রাজেডি হলো বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী জাহাজডুবির ঘটনা। তবুও আজও সেই হাজারো নিঃশব্দ মৃত্যু সেভাবে কোনো স্মৃতির মিনারে জায়গা পায়নি। ইতিহাসের পাতায় যাদের ঠাঁই মেলে না, তাদের মৃত্যু যেন দ্বিতীয়বার মৃত্যু হয়।

এই মর্মান্তিক অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তি, রাজনীতি বা যুদ্ধ নয়—মানবতার কণ্ঠই ইতিহাসের আসল ভাষ্য হওয়া উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত