বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার চায় সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
  • ১৩ বার
বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকার প্রস্তাব

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়ে সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিরোধী শিবিরের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে। দলটি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী দিতে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী-কে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানিয়েছে। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সরকার সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমঝোতাভিত্তিক করতে চায় এবং সে লক্ষ্যেই বিরোধী দলকে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দেখতে আগ্রহী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক যে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সরকার তা বাস্তবে রূপ দিতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান রেখে সংসদ পরিচালনায় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই ধারাবাহিকতায় স্পিকার নির্বাচনের দিনই ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে এবং বিরোধী দল যেন তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করে—সে আহ্বান ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার মনে করে সংসদের কার্যক্রম যত বেশি অংশগ্রহণমূলক হবে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ততই শক্তিশালী হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদে বসানোর উদ্যোগ বিরল হলেও নতুন নয়। অতীতে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে এমন আলোচনা হয়েছে, যদিও সব সময় তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা সংসদীয় সংস্কৃতিতে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে মত দিচ্ছেন অনেকেই। তাঁদের মতে, বিরোধী দল সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর অংশ হলে আইন প্রণয়ন ও বিতর্কের পরিবেশ আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারি দল হিসেবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুটি পদেই প্রার্থী দেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। তবু রাজনৈতিক সহমর্মিতা ও ঐকমত্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার তা করতে চায় না। তিনি ইঙ্গিত দেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন কমাতে পারস্পরিক আস্থা জরুরি, আর সেই আস্থা তৈরির প্রথম ধাপ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ।

তিনি আরও জানান, জুলাই জাতীয় সনদের আলোচনায় দুটি ডেপুটি স্পিকার পদ সৃষ্টির প্রস্তাব ছিল, যার একটি বিরোধী দল পেতে পারে—এমন ধারণা আলোচনায় উঠে আসে। যদিও বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে একজন ডেপুটি স্পিকারই রয়েছে, তবু সেই পদটি বিরোধী দলের জন্য উন্মুক্ত রাখার মাধ্যমে সমঝোতার চর্চা শুরু করতে চায় সরকার। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এসব অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক। তবে সব অধ্যাদেশ যে গৃহীত হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংসদ সদস্যদের আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে কোনগুলো আইন হিসেবে বহাল থাকবে আর কোনগুলো বাতিল হবে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদের স্বাধীন মতামতকে গুরুত্ব দিতে চায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদের প্রথম অধিবেশন সাধারণত আইনগত ও সাংবিধানিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সূচনা করে। সেখানে একদিকে বিরোধী দলকে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রস্তাব দেওয়া এবং অন্যদিকে অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ সংসদের আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া—এই দুটি বার্তা মিলিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অনেকের ধারণা, সরকার সংসদের ভেতরে সংঘাতের বদলে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে, যাতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া বাধাহীনভাবে এগোতে পারে।

তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে, তারা প্রস্তাবটি গ্রহণ করবে কি না এবং করলে কাকে প্রার্থী করবে। বিরোধী শিবিরের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলেও প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানানো হয়নি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রস্তাব গ্রহণ করলে বিরোধী দল সংসদীয় কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে, আর প্রত্যাখ্যান করলে রাজনৈতিক বার্তা ভিন্ন দিকে যেতে পারে।

জনমতের দিক থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে সমঝোতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আবার কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে বলছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনীতিতে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের যে চিত্র দেখা গেছে, তার প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবকে অনেকে নতুন সূচনার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, যদি সরকার ও বিরোধী দল বাস্তবিক অর্থে সমঝোতার পথে হাঁটে, তবে তা শুধু সংসদের কার্যক্রমেই নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে আইন প্রণয়ন, বাজেট আলোচনা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্য গঠনের সম্ভাবনা বাড়বে।

সব মিলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণাকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন দৃষ্টি বিরোধী দলের সিদ্ধান্তের দিকে। তারা প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রার্থী দিলে সংসদীয় ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচিত হতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে এই উদ্যোগ কেবল রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে আপাতত সরকারের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা হলো—সংসদকে কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করতে বিরোধী দলকে পাশে চায় সরকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত