কুয়াশায় থমকাল দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৪৮ বার
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছিল পদ্মা। দৃশ্যমানতা নেমে আসে বিপজ্জনক মাত্রায়। ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দৌলতদিয়া ফেরিঘাট-পাটুরিয়া ফেরিঘাট নৌরুটে মঙ্গলবার ভোর থেকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় ফেরি চলাচল। প্রায় তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে পরিস্থিতির উন্নতি হলে পুনরায় স্বাভাবিক হয় পারাপার। এতে ভোর থেকে ঘাট এলাকায় আটকা পড়ে শত শত যানবাহন ও যাত্রী, সৃষ্টি হয় সাময়িক ভোগান্তি।

ঘাট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সোমবার মধ্যরাতের পর থেকেই পদ্মা নদী এলাকায় কুয়াশা পড়তে শুরু করে। রাত যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে কুয়াশার ঘনত্ব। ভোরের দিকে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে নদীপথে নৌযান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিং বাতি, চ্যানেল নির্দেশক ও নাব্যতার চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল না। নদীর মাঝপথে দৃশ্যমানতা কয়েক মিটারে নেমে এলে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। নিরাপত্তা বিবেচনায় ভোর ৫টা ৫০ মিনিট থেকে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।

এই নৌরুটটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও আশপাশের জেলার অন্যতম প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন এ পথ ব্যবহার করে। ফলে হঠাৎ ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। অনেক যাত্রী ভোরের শীত আর কুয়াশার মধ্যে অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। দূরপাল্লার বাসের যাত্রীরা নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কায় উদ্বেগে পড়েন। পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারার দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

স্থানীয় কয়েকজন যাত্রী জানান, কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ হওয়া নতুন কিছু নয়। তবে হঠাৎ বন্ধের ঘোষণা এলে ভোগান্তি বেড়ে যায়। কেউ কেউ জানান, ভোরের দিকে কুয়াশা এতটাই ঘন ছিল যে ঘাটের কয়েক হাত দূরের বস্তু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নৌযান চলাচল চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। সম্ভাব্য নৌদুর্ঘটনা এড়াতে এবং ঘন কুয়াশায় দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না থাকায় ভোর ৫টা ৫০ মিনিট থেকে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে কুয়াশার ঘনত্ব কমে এলে এবং দৃশ্যমানতা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরলে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পুনরায় ফেরি চলাচল শুরু করা হয়।

তিনি আরও বলেন, শীত মৌসুমে এ নৌরুটে মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কুয়াশা ঘনীভূত হলে নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িক বিরতি দেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই দ্রুত ফেরি চলাচল পুনরায় চালু করা হয়, যাতে যানজট কমানো যায় এবং যাত্রীদের ভোগান্তি সীমিত রাখা সম্ভব হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, পদ্মা নদীর বিস্তৃত জলরাশি ও খোলা পরিবেশে শীতের শেষভাগেও ঘন কুয়াশা দেখা দিতে পারে। নদীপথে চলাচলের ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় ফেরি চলাচলের সময় সঠিক চ্যানেল ধরে চলা ও বিপরীত দিক থেকে আসা নৌযানের অবস্থান নির্ধারণ জরুরি। দৃশ্যমানতা কমে গেলে সংঘর্ষ বা চর এলাকায় আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে দৃশ্যমানতা নেমে এলে নৌযান চলাচল স্থগিত রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

ঘাট এলাকায় দায়িত্বরত কর্মীরা জানান, ফেরি বন্ধ থাকাকালে ঘাটে থাকা ফেরিগুলো নিরাপদ অবস্থানে নোঙর করে রাখা হয়। কুয়াশা কেটে গেলে পর্যায়ক্রমে সেগুলো পারাপার শুরু করে। সকাল থেকে আটকে থাকা যানবাহনগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের চাপ কিছুটা কমে।

স্থানীয় প্রশাসন ও ঘাট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সদস্যরা ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করেন। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ায় সকাল গড়াতেই ঘাট এলাকায় জমে থাকা যানবাহনের সারি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অনেক যাত্রী স্বস্তি প্রকাশ করেন। যদিও কয়েক ঘণ্টার বিলম্ব তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে, তবুও নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্তকে অধিকাংশই যৌক্তিক হিসেবে দেখছেন।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে এ রুটের ভূমিকা অপরিসীম। তাই সাময়িক বন্ধ থাকলেও দ্রুত পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবিষ্যতে নৌপথে উন্নত নেভিগেশন প্রযুক্তি ও কুয়াশা-সহনশীল সিগন্যালিং ব্যবস্থা জোরদার করা হলে এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট সাময়িক এই বিরতি আবারও মনে করিয়ে দিল, নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সামান্য বিলম্ব হয়তো অস্বস্তি তৈরি করে, কিন্তু বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্ক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সবার জন্য কল্যাণকর। কুয়াশা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন আবার সচল হয়েছে ফেরি, তেমনি স্বাভাবিক হয়েছে মানুষের যাত্রা। তবে শীতের শেষভাগে এমন পরিস্থিতি যে আবারও সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত