হরমুজ উত্তেজনায় তেলভাড়া রেকর্ড ৪ লাখ ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৫৩ বার
হরমুজ প্রণালী তেল পরিবহন খরচ

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন খাতে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য একটি সুপারট্যাংকারের ভাড়া সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪ লাখ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে London Stock Exchange Group। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার সময় যে ভাড়া ছিল, তার তুলনায় বর্তমান হার প্রায় দ্বিগুণ।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন কেবল একটি বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করছে। কারণ তেল পরিবহনের ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচ, জ্বালানির খুচরা মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন জীবনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ Strait of Hormuz। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি ঝুঁকি বিবেচনায় তাদের ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

দুই মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল বহনে সক্ষম বৃহত্তম তেলবাহী জাহাজ, যেগুলোকে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি বলা হয়, এখন এই রেকর্ড পরিমাণ ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছে। একটি ভিএলসিসি সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো থেকে পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ আমদানিকারক বাজারে তেল পৌঁছে দেয়। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যয়ের কারণে শিপিং কোম্পানিগুলো ভাড়া বাড়াতে শুরু করেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক তেলের দামে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারত—যেসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

শিপিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেবল ভাড়া নয়, জাহাজের বীমা প্রিমিয়ামও কয়েকগুণ বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রবেশের আগে বিশেষ ‘ওয়ার রিস্ক’ কভারেজ নিতে হচ্ছে, যার খরচও চূড়ান্ত ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।

এই পরিস্থিতির মানবিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ এবং খাদ্যপণ্যের দামে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হয়, কারণ সেখানে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, যদি হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপের মুখে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক বাকযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আর তেহরান বলছে তারা নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত। এই পারস্পরিক কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ধরনের ‘চোক পয়েন্ট’। এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ শতাংশ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ হয়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ইতিহাস বলছে, অতীতে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম দ্রুত লাফিয়ে উঠেছে।

চীনের মতো বৃহৎ আমদানিকারক দেশের জন্য এই বাড়তি ভাড়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দেশটির শিল্প ও উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তেল পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ববাজারে এই পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। শেয়ারবাজারে জ্বালানি ও শিপিং খাতের শেয়ারে ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে আগ্রহ বাড়ছে, কারণ অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখীকরণের দিকে নজর দিচ্ছে।

পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে তেল পরিবহন খরচ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ পরিস্থিতি শান্ত করতে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা। তেল পরিবহনের রেকর্ড ভাড়া সেই অস্থিরতারই প্রতিফলন, যা শুধু বাজারের পরিসংখ্যান নয়—বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও তুলে ধরছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত