প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ভূমি প্রশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ নতুন করে সামনে এলো ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে। বুধবার সকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে হতাশা প্রকাশ করেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, সারা দেশের প্রতিটি ভূমি অফিস কোনো না কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মানুষের অভাব-অভিযোগ রয়েছে, তবে দুর্নীতির অভিযোগই সবচেয়ে বেশি। এককথায় আমলাতান্ত্রিক মনোভাব এখনো বিরাজমান।
সকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসে পৌঁছান প্রতিমন্ত্রী। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অফিস খোলার সময় সকাল ৯টা হলেও তিনি গিয়ে দেখেন কার্যালয় তালাবদ্ধ, ভেতরে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর একজন কর্মচারী এসে তালা খুললে তিনি ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে একে একে কর্মকর্তারা আসতে শুরু করেন। কেউ পৌনে ১০টায়, কেউ ১০টার পরে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, জনগণের সেবা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে একটি বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। মানুষ জানে না তাদের আবেদন বা কাজ কত দিনে সম্পন্ন হবে, কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বা কত টাকা সরকারি ফি নির্ধারিত। এই তথ্যের অভাব থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে জনগণের সঙ্গে যে সম্পৃক্ততা থাকার কথা, বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। ভূমি অফিসে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন যে সেবা গ্রহণকারীদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের আচরণে প্রয়োজনীয় আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী এর নির্দেশনায় ভূমি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত করা হচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকার হচ্ছে জনগণের ভোগান্তি কমানো এবং সেবা প্রাপ্তিকে সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা। তিনি বলেন, আমরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করেছি।
সিদ্ধিরগঞ্জ ভূমি অফিসে উপস্থিত কয়েকজন সেবা গ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, মিউটেশন কিংবা অন্যান্য সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপের অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ জানান, নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি উপস্থিত কর্মকর্তারা।
ভূমি প্রশাসন দেশের অন্যতম স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত। জমি সংক্রান্ত বিরোধ, উত্তরাধিকার, নামজারি, খতিয়ান সংশোধন—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটালাইজেশন ও অনলাইন সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সেবা প্রক্রিয়া বোর্ডে টানানো, নির্ধারিত ফি প্রকাশ করা এবং অভিযোগ গ্রহণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করা—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি জানান, এ ধরনের আকস্মিক পরিদর্শন সারা দেশে অব্যাহত থাকবে।
পরিদর্শনের সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। কেন নির্ধারিত সময়ে অফিস খোলা হয়নি, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দায়িত্বে অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের চর্চিত আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেবা প্রদানকে সহজ ও মানবিক করতে না পারলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আচরণগত পরিবর্তন জরুরি।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ভূমি খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে উচ্চপর্যায়ের এমন সরাসরি নজরদারি ও প্রকাশ্য অসন্তোষ প্রশাসনিক সংস্কারের বার্তা দেয়। প্রশ্ন হলো, ঘোষিত পদক্ষেপ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে।
দিনশেষে এই পরিদর্শন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ভূমি অফিসে সেবার মান উন্নত হবে কি না, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে পরিবর্তন আসবে কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়। জনগণ চায় সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবায়নের মধ্যেই এর সাফল্য নির্ধারিত হবে।