প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় আগামী ৯ এপ্রিল ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেল বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেন। এই মামলাটি বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় গত বছরের ৩০ জুন ৩০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। মামলায় মোট ২৫ জন সাক্ষ্য দেন, যার মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৩০ আসামির মধ্যে ইতিমধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
২০১৮ সালের ১৬ জুলাই, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলা আন্দোলনের সময় আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তখন তার বয়স মাত্র ২৫ বছর। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন।
নিরস্ত্র আবু সাঈদের পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে অংশ নেন, যা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে আরও গতিশীল করে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা।
২০১৮ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে সরকারি বাহিনী, দলীয় ক্যাডার ও প্রশাসনের অংশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অংশ দ্বারা গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়া অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা নিয়ে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার চলছে। শহীদ আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
আদালত প্রক্রিয়ায় তদন্তকালে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইনজীবীরা মামলার সমস্ত প্রমাণাদি উপস্থাপন করেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই মামলা বিশেষ নজর কাড়ে, কারণ এটি শুধুমাত্র একজন শিক্ষার্থীর হত্যার বিচার নয়, বরং ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অংশ।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণার পর জনগণ এবং নিহত শিক্ষার্থীর পরিবার এই রায়ের দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখবেন। শহীদ আবু সাঈদের পরিবার ও ছাত্রসমাজ আশা করছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দোষীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হবে। হত্যাকাণ্ড এবং মামলা দেশের মানুষের মনে দীর্ঘদিনের ব্যথা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
এই মামলার রায় আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্বকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরবে। এটি দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে গণ্য হবে।
শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি এবং তার মৃত্যুর পর ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থায়ী হবে। রায়ের দিন ঘোষণার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্তির দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।