সংঘর্ষ-পোড়াওর পর থমথমে গোপালগঞ্জ, চলছে কারফিউ ও বিশেষ অভিযান

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫
  • ৪০ বার
সংঘর্ষ-পোড়াওর পর থমথমে গোপালগঞ্জ, চলছে কারফিউ ও বিশেষ অভিযান

প্রকাশ: ১৭ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের এক উত্তাল দিন পার করে এখন থমথমে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে শহরজুড়ে বিশেষ অভিযান। বুধবারের রক্তাক্ত সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলা এবং চারজন নিহত হওয়ার ঘটনার পর গোপালগঞ্জে জারি করা হয়েছে কারফিউ।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পুরো শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল সীমিত, বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ দোকানপাট ও বাজার। তবে অলিগলিতে কিছু মানুষ জরুরি প্রয়োজনের কারণে বাইরে বের হয়েছেন। মূল সড়কে কোনো অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন চোখে পড়েনি। শহরের বিভিন্ন মোড়ে চা দোকান ও রেস্তোরাঁ খোলার চিত্র দেখা গেলেও মুখে-মুখে ঘুরছে আতঙ্কের গল্প।

গোপালগঞ্জ সদর সার্কেল পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহরের পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। যেসব ব্যক্তি দফায় দফায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ছিলেন—তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার পর শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও এখনো পড়ে আছে ইটপাটকেল, বাঁশ ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধক সামগ্রী। গাছ কেটে ফেলে রাস্তা অবরোধের চেষ্টার চিহ্ন রয়েছে। বিভিন্ন তোরণ ভেঙে রাস্তায় ফেলে রাখায় যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসব সরিয়ে নিতে কাজ করছেন।

শহরের বাসিন্দা মো. ইকবাল হোসেন জানান, সংঘর্ষের রাতে তার মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তিনি খাবার নিয়ে যেতে পারেননি। ভোরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হওয়ায় বের হয়েছেন, তবে আতঙ্ক এখনো কাটেনি।

অটোরিকশা চালক মাহফুজ আলম বলছিলেন, “গাড়ি নিয়ে বের হইনি। কারফিউ জারি হয়েছে, রাস্তা ফাঁকা। লোকজনও তেমন নেই। তবুও দূরপাল্লার কিছু বাস চলছে।”

বুধবার বেলা দেড়টা থেকে বিকেল পর্যন্ত শহরের পৌরপার্ক এলাকায় সংঘর্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। এনসিপির মঞ্চে হামলা, পুলিশ ও ইউএনওর গাড়িতে আগুন দেওয়া, সরকারি অফিস ঘেরাওসহ নানা ঘটনার জেরে শহরের নিয়ন্ত্রণ কার্যত হারায় প্রশাসন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার পর কারফিউ জারি করা হয়।

বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মীরা এনসিপির পদযাত্রাকে ঠেকাতে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামে। এনসিপির গাড়িবহর শহরে প্রবেশের আগেই শুরু হয় সংঘর্ষ। সংঘাতের একপর্যায়ে এনসিপির শীর্ষ নেতারা আশ্রয় নেন পুলিশ সুপার কার্যালয়ে। পরে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনার আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। বিভিন্ন ভিডিও, পোস্ট ও মন্তব্যে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।

এখনো পর্যন্ত সহিংসতা ও সংঘর্ষে আহত-নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, গোপন অভিযানে গত রাতেই বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় টহল জোরদার করেছে।

এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা করতে চেয়েছিলাম। সরকারের দলীয় বাহিনী ও পুলিশের সম্মিলিত হামলায় তা রক্তাক্ত হল। এ ঘটনার বিচার চাই।’

গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের এই রক্তাক্ত পরিণতি এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে তা দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে শহরটিকে ‘উচ্চ নিরাপত্তা এলাকা’ ঘোষণা করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একটি আতঙ্কময় রাত পার করে নতুন ভোরে গোপালগঞ্জ এখন এক অনিশ্চিত অপেক্ষার নগরী। শান্তি ও স্থিতির প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছে সাধারণ মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত