প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মতিঝিলে এক শীর্ষস্থ কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ রুমমেটকে হত্যা এবং লাশ সাত টুকরো করার ঘটনাটি দেশব্যাপী শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার শাহীন আলম নামে অভিযুক্ত রুমমেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহরিন হোসেনের নেতৃত্বে তদন্তকারীরা তাকে আদালতে হাজির করলে, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জবানবন্দি রেকর্ড করে পরে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে। মতিঝিলের কবি জসীম উদ্দীন রোডের একটি ছয় তলা ভবনের বাসায় হোমিও ক্লিনিকের মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ শুটিং করা হয়েছিল না। পরবর্তীতে জানা যায়, শাহীন আলম ক্ষোভে ভেঙে চাপাতি দিয়ে ওবায়দুল্লাহকে হত্যা করেন। হত্যার পর রাগ ও আতঙ্ককে ঢেকে রাখতে তিনি লাশকে সাত টুকরো করে শহরের বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন। পুলিশের অনুসন্ধানে দেখা যায়, লাশের অংশগুলো নয়াপল্টন, গুলিস্তান, কমলাপুর এবং আমিনবাজারের সালেহপুর সেতুর নিচে উদ্ধার করা হয়।
২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে নিহতের খণ্ডিত অঙ্গাবলী পাওয়া যায়। ওই সময় স্থানীয় হোটেল কর্মচারী শাহীনকে সন্দেহজনক অবস্থায় দেখেন এবং পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ২ মার্চ শাহীনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদে শাহীন আলম হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং লাশ সাত টুকরো করার ঘটনাটিও নিশ্চিত করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহরিন হোসেন বলেন, “আসামি হত্যার বিষয়টি আদালতে স্বীকার করেছেন। এ জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আমরা হত্যাকাণ্ডের পেছনের পুরো বিষয়টি উদঘাটন করার চেষ্টা করছি।”
নিহত মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ শিবপুর, নরসিংদী জেলার বাসিন্দা ছিলেন। অভিযুক্ত শাহীন আলম হবিগঞ্জের বাসিন্দা। দুজনই মতিঝিলের ওই বাসার ছয় তলায় রুমমেট হিসেবে বসবাস করতেন। প্রতিবেশী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হত্যার আগে দুজনের মধ্যে পারস্পরিক উত্তেজনা ও কলহ চলছিল। তবে আগের কোনো সংঘর্ষ বা বড় মনোমালিন্যের খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়ে সাহায্য করেন, যার মাধ্যমে দ্রুত নিহতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের বিবরণ অনুযায়ী, নিহত ওবায়দুল্লাহ ছিলেন শান্তপ্রিয় ও সুশৃঙ্খল ব্যক্তি। তার মৃত্যু এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেশীরা জানান, “শহরের মধ্যে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। আমরা ভয় পাচ্ছি। একজন মানুষকে এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা মানে সাধারণ মানুষদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করা।”
মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, “এই হত্যা ও লাশ সাত টুকরো করার ঘটনায় আমরা সকল প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। অভিযুক্তের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরও আমরা আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। আমরা চাই, সকল প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হোক।”
এ ঘটনার মানবিক ও সামাজিক দিকও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত এবং ঘর-বাড়ি, কমিউনিটি সুরক্ষার ক্ষেত্রে আরো সচেতন হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড সামাজিক সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলার প্রয়াসকে আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
জানা গেছে, নিহত ওবায়দুল্লাহ একটি হোমিও ক্লিনিকের মার্কেটিং বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সাধারণ ছিল। আর শাহীন আলম আইন সংক্রান্ত ক্ষেত্রে জড়িত ছিলেন এবং তার পেশাগত পরিচয়ও রয়েছে। কিন্তু পারস্পরিক কলহ ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।
মতিঝিলে রুমমেট হত্যার সাত টুকরো কাণ্ডটি শুধুমাত্র রাজধানী নয়, সারাদেশের মানুষকে শোক ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনার মাধ্যমে রাজধানীর নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা আরও দৃঢ়ভাবে উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার ও যথাযথ আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণ আশা করছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
এ ঘটনার আদালত প্রক্রিয়া এবং তদন্তের অগ্রগতি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে আদালতের জন্য অভিযোগ প্রমাণ করার প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ হবে। তবে, হত্যার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলোও সমানভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় এমন হত্যাকাণ্ড জনজীবন ও শহরের সামাজিক নিরাপত্তার প্রতি সর্তক বার্তা দেয়। শহরের কেন্দ্রস্থলে এক ব্যক্তি হত্যার পর লাশ সাত টুকরো করা মানে সমাজের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং আইনশৃঙ্খলার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া।
মতিঝিলে রুমমেট হত্যার সাত টুকরো কাণ্ড দেশের সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলার ইতিহাসে দাগ কেটে গেছে। নিহত ওবায়দুল্লাহর পরিবার এখনও শোকগ্রস্ত এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাইবেন। দেশের মানুষও আশা করছেন, অভিযুক্ত শাহীন আলমকে দ্রুত ও কঠোর শাস্তি দেয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংসতার পথ অনুসরণ করতে না পারে।