প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সোমবার সকাল ৮টা নাগাদ কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রবেশ করলে দেখা যায় হাসপাতাল একেবারে নিরব। সাধারণ রোগীরা হাসপাতালে ভিড় করতে শুরু করলেও ডাক্তারদের উপস্থিতি প্রায় শূন্য। হাজিরা খাতা এবং ডিউটি রোস্টার যাচাই করা হলে জানা যায়, এখানে মোট ২৬ জন চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র তিনজনই উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ ২৩ জন চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন।
হাজিরা থাকা চিকিৎসকরা হলেন ডা. জাহিদ, ডা. এম জামান এবং ডা. ফরহাদ আবেদীন। রোস্টার অনুযায়ী ২৬ জনের মধ্যে চারজন ছুটিতে ছিলেন বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. মালেকুল আফতাব ভূঁইয়া। তিনি আরও জানান, নিজে কুমিল্লা সিভিল সার্জন অফিসে মাসিক সমন্বয় সভায় থাকায় হাসপাতালে আসতে পারেননি। বাকি চিকিৎসকরা কেন উপস্থিত ছিলেন না, তা তিনি খতিয়ে দেখছেন।
হাসপাতালের অফিস সহকারী সজল চন্দ্র দাস জানান, এখন পর্যন্ত তিনজন ডাক্তার এসে উপস্থিত হয়েছেন, বাকিরা আসবেন বলে প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু সাধারণ রোগীদের বক্তব্য ভিন্ন। সাইফুল ইসলাম নামে এক রোগী বলেন, তিনি আধা ঘণ্টা ধরে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, টিকেট কাউন্টার এখনও খোলা হয়নি এবং ডাক্তাররা রুমে নেই। রুমের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় চিকিৎসা সম্ভব হয়নি।
হরিপুর গ্রামের আবু ইউসুফের মেয়ে মারিয়া আক্তার দুর্ঘটনার কারণে হাসপাতালে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কুমিল্লা প্রেরণ করেছেন। মারিয়ার মা আকলিমা আক্তার বলেন, বড় ডাক্তার না থাকায় তাদেরকে কুমিল্লা পাঠানো হয়েছে, যা তার জন্য খুবই ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।
কুমিল্লা সিভিল সার্জন আলী নুর মোহাম্মদ বশির বলেন, সকল সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের সকাল ৮টায় উপস্থিত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৬ জনের মধ্যে মাত্র তিনজনের উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি আরও জানান, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের উপস্থিতি না থাকার কারণে রোগীরা প্রতিদিনের চিকিৎসা নিতে বিপাকে পড়ছেন। জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হলে তাদেরকে কুমিল্লা শহরে বা অন্য জেলা হাসপাতালগুলোতে পাঠাতে হচ্ছে, যা রোগী ও পরিবারের জন্য অতিরিক্ত চাপ ও আর্থিক বোঝা তৈরি করছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার শিকার বা জরুরি রোগীর পরিবার এই অনুপস্থিতির কারণে মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে পড়ছেন।
এই অনুপস্থিতি শুধু রোগীদের নয়, হাসপাতালের সাধারণ কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করছে। সকাল ৮টার পর ডাক্তারদের অনুপস্থিতি বারান্দায় রোগীর ভিড় বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে যায়। রোস্টার অনুযায়ী সঠিকভাবে উপস্থিত না থাকা চিকিৎসকরা শুধুমাত্র হাসপাতালে নয়, রোগীর জীবন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন।
ডা. মো. মালেকুল আফতাব ভূঁইয়া জানিয়েছেন, রোস্টার অনুযায়ী যেসব চিকিৎসক উপস্থিত থাকবেন, তাদের অনুপস্থিতির কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আশা করেন, দ্রুত সময়ে সকল ডাক্তার নির্ধারিত সময়মতো কর্মস্থলে হাজির হবেন এবং হাসপাতালের সেবা প্রদান স্বাভাবিক হবে।
বুড়িচং উপজেলার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুপস্থিত চিকিৎসকের সংখ্যা এত বেশি হওয়ায় জনগণের আস্থা কমছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। স্থানীয়রা দাবি করছেন, সরকারি নির্দেশনা সঠিকভাবে কার্যকর না হলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উচিত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই ধরনের অনুপস্থিতির ঘটনা পুনরায় যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করা। রোগী ও পরিবারদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিরতার পাশাপাশি প্রশাসনিক তদারকিও অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, শুধু ডাক্তারদের উপস্থিতি নয়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষতা ও রোগীর প্রতি দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার মান বজায় রাখার জন্য প্রশাসনকে দ্রুত এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।