প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরান আশ্বস্ত করেছে যে, বাংলাদেশের জন্য তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের কারণে বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন নৌ করিডর ঝুঁকির মুখে পড়ায় বাংলাদেশ সরকার এ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সরকার ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়েছে। ইরান সম্মতি জানিয়ে বাংলাদেশের জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগেই তা জানাতে অনুরোধ করেছে। ফলে দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহে যে আশঙ্কা ছিল তা অনেকটাই কমেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ইতিমধ্যেই সিঙ্গাপুর থেকে ২৭,০০০ টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ পৌঁছেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে আরও চারটি জাহাজ প্রায় ১,২০,২০৫ টন তেল নিয়ে বন্দরে আসার কথা রয়েছে। এছাড়া এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণের জন্য সরকার বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি তিন লাখ টন ডিজেল আমদানি করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার চুক্তির বাইরে সরাসরি ক্রয়ের পরিকল্পনা করছে। এতে দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১২,০০০ টন হলেও বর্তমান সরবরাহ প্রায় ৯,০০০ টন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আসন্ন পাঁচটি চালান দেশের ১ লাখ ৪৭,২০৫ টন জ্বালানি সরবরাহ করবে, যা প্রায় ১৬ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট।
চট্টগ্রাম বন্দরের শিপিং এজেন্টরা জানিয়েছেন, ‘শিউ চি’ নামের ট্যাংকার সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি ‘লিয়ান হুয়ান হু’ রাতের পর বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। ‘এসপিটি থেমিস’ নামের আরেকটি ট্যাংকার বৃহস্পতিবার আসবে। এছাড়া ‘র্যাফেলস সামুরাই’ ও ‘চাং হাং হং তু’ শনিবার বন্দরে পৌঁছাবে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল থাকবে। প্রাইড শিপিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই চারটি ট্যাংকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্দরে পৌঁছাবে।
সরকারের জরুরি আমদানির উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে বিকল্প উৎস থেকে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল সংগ্রহ করা হবে। জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় উত্তর আমেরিকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি আমদানির প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে।
চীন ও ভারতও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা প্রদানের আগ্রহ দেখিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে চীন ও ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করছে। চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, প্রয়োজনে চীন বাংলাদেশকে সরাসরি জ্বালানি সহায়তা দিতেও আগ্রহী।
বিদ্যমান বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের আওতায় বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার টন ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে। তবে চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অতিরিক্ত সরবরাহ মূলত মার্চের শেষ সপ্তাহ ও এপ্রিলের পুরো চাহিদা মেটাতে ব্যবহার হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ আটটি দেশ থেকে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে। এগুলো হলো—মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ওমান ও কুয়েত। দেশের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।
সরবরাহে বিঘ্ন এড়িয়ে চলার জন্য সরকার মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে দেশের সব জেলা প্রশাসককে তেলের বাজারে স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া, জ্বালানি সরবরাহ, বাজারে পর্যবেক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি দ্রুত করার জন্য কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করা হয়েছে।
জ্বালানি সচিব বলেন, চলমান বোরো মওসুমে কৃষকদের সেচে জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ চেইন ঠিক রাখতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে তেলের অভাব না হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে ১ লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল, ২৩ হাজার টন অকটেন, ১৫ হাজার টন পেট্রোল এবং ৬৭ হাজার টন ফার্নেস অয়েল মজুদ রয়েছে। এছাড়া জেট এ–১ এভিয়েশন ফুয়েলের মজুদ প্রায় ৬০ হাজার টন। এগুলো যথেষ্ট সময়ের জন্য দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম।
সরকার ও বিপিসি আশা করছে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। দেশে তেলের বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব কৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে আগামীর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলমান সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।